নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান: জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে নিখোঁজ ৯৩ শ্রমিক, থার্মাল ড্রোনেও মেলেনি সাড়া

বিশেষ প্রতিবেদন: নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানের পর উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন উদ্ধারকারীরা। রাসুয়া জেলার ‘রাসুয়াগাধী হাইড্রোপাওয়ার প্রজেক্ট’ (Rasuwagadhi Hydropower Project)-এর একটি টানেলে কর্মরত ৯৩ জন শ্রমিকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। নিখোঁজদের খুঁজতে অত্যন্ত আধুনিক থার্মাল ড্রোন ব্যবহার করা হলেও টানেলের গভীরে মানুষের উপস্থিতির কোনো চিহ্ন মেলেনি।
টানেলে তল্লাশি ও উদ্বেগ
ভোটকোশি নদীর জলস্তর আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পর ধারণা করা হয়েছিল, শ্রমিকরা হয়তো জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের নিরাপদ প্রান্তে আশ্রয় নিয়েছেন। এর পরেই নেপালি সেনা, প্রকৌশলী এবং ড্রোন অপারেটরদের একটি যৌথ উদ্ধারকারী দল অভিযানে নামে।
বিপদসংকুল পথ পেরিয়ে দলটি টানেলের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়। যেসব দুর্গম অংশে মানুষের পক্ষে সরাসরি প্রবেশ করা আসাম্ভব, সেখানে তাপ-সংবেদনশীল থার্মাল ড্রোন পাঠানো হয়। কিন্তু ড্রোনের সিসিটিভি বা হিট ক্যামেরায় কোনো জীবন্ত মানুষের সংকেত ধরা পড়েনি। এতে ৯৩ জন শ্রমিকের পরিণতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে স্থানীয় প্রশাসন এখনো আশা ছাড়েনি। তাঁরা কাদার স্তূপে আটকা পড়েছেন, বানের স্রোতে ভেসে গেছেন, নাকি বানের শুরুতেই কোনো নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পেরেছেন—তা নিশ্চিত করতে অনুসন্ধান জারি রাখা হয়েছে।
একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিপর্যয়
শুধুমাত্র রাসুয়াগাধী নয়, বন্যায় রাসুয়া ও নুওয়াকোট জেলার একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রজেক্টের টানেল ও ভূগর্ভস্থ অংশ থেকে প্রায় ৯৩৩ জন শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন।
- আপার ত্রিশূলী-১ প্রজেক্ট: বিপুল সংখ্যক আটকে পড়া শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ২৫০ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
- আপার ত্রিশূলী-3A এবং 3B: এই প্রজেক্টগুলোতে এখনো বহু শ্রমিক নিখোঁজ। কাদা, জল ও ধ্বংসস্তূপ জমে থাকায় তল্লাশি কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
হাজার ছাড়াল নিখোঁজ ও মৃতের সংখ্যা
২৬ আগস্টের এই বিপর্যয়ের পর নেপালজুড়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়ে গেছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৫ হাজারের বেশি মানুষ। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে অধিকাংশ মৃতদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। ডিএনএ (DNA) নমুনা সংগ্রহ করে পরিচয় উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। মৃতদেহের ডিএনএ পরীক্ষায় সাহায্য করতে ভারতের গুজরাট থেকে ‘ন্যাশনাল ফরেনসিক সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটি’ (NFSU)-র বিশেষ টিম নেপালে পৌঁছেছে।
বর্তমানে নেপালি সেনার পাশাপাশি ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার কারিগরি দল যৌথভাবে এই উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছে। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে টানেলের মুখ খোলার চেষ্টা চলছে।
সময় গড়ালেও উদ্ধারকারীরা আশা হারাননি। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ৩ দিন পর ৬ বছরের এক শিশুকন্যাকে জীবন্ত উদ্ধার করার মতো ঘটনা উদ্ধারকারীদের মনোবল বজায় রাখতে সাহায্য করছে। তবে রাসুয়াগাধীর ৯৩ জন শ্রমিকের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা জানতে পুরো টানেল পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে।