কোটি কোটি টাকা বরাদ্দের পরেও খালি হাত! সিএজি রিপোর্টে প্রকাশ বাংলায় শিক্ষা ব্যবস্থার কঙ্কালসার ছবি

কোটি কোটি টাকা বরাদ্দের পরেও খালি হাত! সিএজি রিপোর্টে প্রকাশ বাংলায় শিক্ষা ব্যবস্থার কঙ্কালসার ছবি

শিক্ষা খাতে বরাদ্দের অভাব নেই, অথচ কাজের বেলায় শূন্য! রাজ্য শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর কಂಟ্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (CAG)-এর সাম্প্রতিক অডিট রিপোর্টে উঠে এসেছে এক চরম উদ্বেগজনক চিত্র। ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষ পর্যন্ত রাজ্য সরকারের সামগ্রিক শিক্ষা কার্যক্রম খতিয়ে দেখে এই অডিট রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে।

রিপোর্টে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, শিক্ষা খাতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও তা সঠিক সময়ে ব্যবহার করতে পারেনি পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

১. আর্থিক অব্যবস্থাপনা ও ফান্ডের হিসাবহীনতা

  • টাকা খরচে গাফিলতি: ‘সমগ্র শিক্ষা’ প্রকল্পে গত পাঁচ বছরে রাজ্য মাত্র ৪৬% থেকে ৬৫% বরাদ্দ অর্থ ব্যবহার করতে পেরেছে।
  • ঘাটতি ও দেরি: কেন্দ্রের থেকে টাকা পেতে এবং রাজ্যের নিজের অংশের ফান্ড ছাড়তে দীর্ঘ বিলম্ব হয়েছে। এর ফলে মোট ২,৪২৭.৮৭ কোটি টাকার ফান্ড ঘাটতি তৈরি হয়।
  • ৬৮২ কোটি টাকার হিসাব মিলছে না: ব্যবহারের শংসাপত্র ও অগ্রিম খাতার অভাবে কোটি কোটি টাকার হিসাব মেলেনি, যা আর্থিক অনিয়মের চরম ঝুঁকি বাড়ায়।
  • অনুমোদিত কাজ বাতিল: ২০০৪-১০ সালের মধ্যে অনুমোদিত ৪,০৩৪টি নির্মাণকাজ (শ্রেণিকক্ষ, শৌচাগার, র‍্যাম্প) ২০১৯ পর্যন্ত শুরুই হয়নি এবং ৩৯৫.৩৪ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।

২. শিক্ষকদের চরম বৈষম্য ও ঘাটতি

  • শিক্ষকহীন স্কুল: রাজ্যের ৫২০টি প্রাথমিক স্কুলে কোনো শিক্ষকই নেই! ফলে প্রায় ৮,৫৯৬ জন শিশুর ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
  • এক-শিক্ষকের ভরসায় স্কুল: ৫,১৫২টি প্রাথমিক স্কুলে মাত্র ১ জন করে শিক্ষক রয়েছেন।
  • শিক্ষক বণ্টনে বৈষম্য: ২১,৬৭৯টি স্কুলে প্রয়োজনের চেয়ে ৩২,৮৪০ জন অতিরিক্ত শিক্ষক রয়েছেন, আবার ১৯,১৬৫টি স্কুলে৩১,৬৮৪ জন শিক্ষকের চরম ঘাটতি রয়েছে।
  • উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ফাঁকা পদ: ২০% স্কুলে কোনো প্রধান শিক্ষক নেই। হাজার হাজার স্কুলে শরীরশিক্ষা ও কর্মশিক্ষার পদ খালি।
  • প্রশিক্ষণে চরম অবহেলা: শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ ৫৬.২৬ লক্ষ টাকার মধ্যে খরচ হয়েছে মাত্র ১.১৯% (০.৬৭ লক্ষ টাকা)।

৩. বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের বঞ্চনা

  • বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য রাজ্যে প্রায় ৩৩,৮৩৫ জন বিশেষ শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে।
  • প্রায় ৭২% সরকারি স্কুলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য উপযোগী শৌচাগার নেই এবং ১৫,৫০-এর বেশি স্কুলে কোনো রাম্প নেই।
  • যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও হাজার হাজার শিক্ষার্থী যাতায়াত ভাতা ও স্কলারশিপ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

৪. ঝরে পড়া শিক্ষার্থী ও শিক্ষার নিম্ন মান

  • স্কুলছুটের হার বৃদ্ধি: প্রাথমিক স্তরে ভর্তির হার ভালো হলেও সপ্তম থেকে নবম শ্রেণিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় ৪২% শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। দারিদ্র্য ও কাজের উদ্দেশ্যে পরিযায়ী হওয়া এর প্রধান কারণ।
  • মডেল স্কুলের করুণ দশা: রাজ্যের ৬০টি মডেল স্কুলের প্রতিটিতে ৬৪০ জন শিক্ষার্থী থাকার কথা থাকলেও গড় উপস্থিতি মাত্র ১১৮ জন (১৮%)। একটি স্কুলে কোনো শিক্ষার্থীই নেই!
  • পড়াশোনায় দুর্বলতা: সিএজি-র নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেছে, দশম শ্রেণির প্রায় ৬২% এবং তৃতীয় শ্রেণির ৫৭% শিক্ষার্থী অঙ্কে ৪০ শতাংশের কম নম্বর পেয়েছে।
  • ডিজিটাল ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার অভাব: ৪৭% স্কুলে কম্পিউটার ল্যাব নেই এবং ৭০% স্কুলে তথ্য-প্রযুক্তি শিক্ষক নেই। জাতীয় শিক্ষানীতির লক্ষ্যমাত্রা ৫০% হলেও মাত্র ৭.৯২% স্কুলে বৃত্তিমূলক শিক্ষা চালুর উদ্যোগ দেখা গেছে।

৫. নজরদারির অভাব ও CAG-এর সুপারিশ

রিপোর্টে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে ‘সমগ্র শিক্ষা’ প্রকল্পের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সমন্বয়কারী পরিচালন পরিষদ একটি বৈঠকও করেনি। সিংহভাগ স্কুলেই ‘স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি’ এবং কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা ছিল না।

সিএজি-র বার্তা: সিএজি স্পষ্ট জানিয়েছে, শুধু শিশুদের স্কুলে এনে ভর্তির হার দেখানোই যথেষ্ট নয়। আসল চ্যালেঞ্জ হলো বরাদ্দ অর্থ সঠিক সময়ে শ্রেণিকক্ষে পৌঁছানো, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *