প্রবীণ না নবীন? দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আসল রূপ কোনটি!

প্রবীণ না নবীন? দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আসল রূপ কোনটি!

দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার চেহারা ঠিক কেমন? বাংলায় আমরা যাঁকে হাতির পিঠে চড়া, নানা যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত এক সুদর্শন নবীন পুরুষ হিসেবে দেখি, উত্তর বা পশ্চিম ভারতের চিত্রটা কিন্তু একেবারেই আলাদা। সেখানে তিনি দীর্ঘ শ্বেতশুভ্র দাড়ি-গোঁফযুক্ত, রাজহাঁসে সওয়ার এক প্রবীণ কারিগর। দেবশিল্পীর এই দুই রূপের পেছনে জড়িয়ে আছে প্রাচীন শাস্ত্র এবং এক শতাব্দীর সামাজিক ইতিহাস।

বৈদিক ও পৌরাণিক প্রবীণ রূপ

  • ঋগ্বেদের আদি রূপ: ঋগ্বেদে বিশ্বকর্মাকে ব্রহ্মার মতোই সমগ্র জগতের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বৈদিক যুগে তাঁর নির্দিষ্ট কোনো মূর্তি ছিল না, তবে রাজহাঁসে উপবিষ্ট প্রবীণ দেবতাকে ব্রহ্মার সমতুল্য মানা হতো।
  • পুরাণের স্থপতি: লঙ্কা, দ্বারকা, ইন্দ্রপ্রস্থ নির্মাণ কিংবা পুরীর জগন্নাথদেবের মূর্তি গড়া—পৌরাণিক গল্পে এই প্রবীণ বিশ্বকর্মার উল্লেখই মেলে। হিমাচল প্রদেশসহ ভারতের নানা অঞ্চলে আজও এই গুরুগম্ভীর রূপেই তিনি পূজিত হন।

বাংলায় যেভাবে এলেন ‘নবীন’ বিশ্বকর্মা ব্রিটিশ গবেষক এম. এম. আন্ডারহিলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রাচীনকালে বিশ্বকর্মার কোনো মূর্তি ছিল না; কেবল ঘট বসিয়ে পুজো করার রীতি ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় যখন শিল্প বিপ্লব শুরু হয় এবং একের পর এক কারখানা গড়ে ওঠে, তখন শ্রমিক শ্রেণির কাছে প্রয়োজন হয়ে পড়ে এক নতুন আবেগের।

যন্ত্রপাতি নিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করা শ্রমজীবীরা নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে এক উদ্যমী ও শক্তিশালী দেবতাকে কল্পনা করতে শুরু করেন। সেই চাহিদা থেকেই রাজহাঁস বদলে যায় হস্তিবাহনে, আর সাদা দাড়ি-গোঁফের প্রবীণ রূপ স্থান ছেড়ে দেয় চতুর্ভুজ সুদর্শন এক যুবকের হাতে—যাঁর চার হাতে শোভা পায় দাঁড়িপাল্লা, কুঠার, হাতুড়ি এবং তির-ধনুক।

শ্রমিক সমাজ ও লোকগাথা বিশ্বকর্মা কেবল শাস্ত্রে সীমাবদ্ধ নন, তিনি কারিগর, মেকানিক, গাড়ি চালক ও শিল্পশ্রমিকদের একাত্ম হওয়ার উৎসব। এমনকি বাংলা সাহিত্য ‘মনসামঙ্গল’-এও বিশ্বকর্মার উপস্থিতি স্পষ্ট। মনসা দেবীর চাপে পড়ে বেহুলা-লখিন্দরের লোহার বাসুগৃহে ছোট একটি ছিদ্র রেখে তিনি মানব নিয়তি নির্ধারণে অংশ নিয়েছিলেন।

স্থানীয় সংস্কৃতি, শিল্পায়ন ও সময়ের প্রয়োজনেই এককালের বৈদিক সৃষ্টিকর্তা আজ বাংলার কারখানায় কারখানায় ছড়িয়ে থাকা মেহনতি মানুষের ‘নবীন’ দেবশিল্পী।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *