রবিবারের মাংস-ভাতে সাই, কিন্তু বলিদানে আপত্তি? দুর্গাপুজোর ‘পশুবলি’ নিয়ে কী বলছে আসল শাস্ত্র?

‘এত রক্ত কেন?’— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রাজর্ষি’ উপন্যাসে জয়সিংহের উদ্দেশ্যে ছোট্ট হাসির এই প্রশ্ন আজও শক্তিপুজোয় পশুবলির প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখায়। সম্প্রতি বাগেশ্বর বাবা বাংলার দুর্গাপুজোয় পশুবলি প্রথা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এই বিতর্ক ফের উসকে দিয়েছেন। কিন্তু হিন্দু শাস্ত্র কি সত্যিই কেবল রক্তপাত বা পশুপাতকেই ‘বলি’ বলে? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে অন্য কোনো গভীর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা?
১. ‘বলিদান’ শব্দের প্রকৃত অর্থ কী?
অভিধান অনুযায়ী, ‘বলি’ মানে কখনোই হত্যা নয়। ‘বলি’ শব্দের মূল অর্থ হলো উপহার বা নিবেদন, আর ‘দান’ মানে ত্যাগ। শাস্ত্র মতে, দেবতাকে বিশেষ কোনো বস্তু অর্পণ করাই হলো বলিদান।
এখানে মনে রাখা জরুরি— বলিদান ও পশুঘাত এক বিষয় নয়।
- বলিদান: দেবতাকে কোনো উপাদান উৎসর্গ করা (যা চালকুমড়ো, আখ, মিষ্টি বা ঘি-ও হতে পারে)।
- পশুঘাত: পশুবধ করে বলি দেওয়া।
ঋগ্বেদ, রামায়ণ, মহাভারত, কালিকা পুরাণ ও মহানির্বাণ তন্ত্রের মতো একাধিক শাস্ত্রে বলির উল্লেখ রয়েছে।
২. ষড়রিপু ত্যাগই কি আসল বলি?
গবেষক তমোঘ্ন নস্কর তাঁর ‘কালী কথা’ গ্রন্থে স্পষ্ট লিখেছেন, বলির মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের অন্তরের ছয়টি শত্রু বা ষড়রিপু (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য) বিসর্জন দেওয়া। এই অপগুণ দমন না করলে মাতৃচরণ লাভ আসাম্ভব। রিপুদমনের এই প্রতীক হিসেবেই শাস্ত্রে বলির প্রচলন।
৩. সাধকের শ্রেণিভেদে কার কী বলি দেওয়া উচিত?
শাস্ত্র অনুযায়ী, সবাই সব বস্তু বলি দেওয়ার অধিকারী নন। সাধকের মানসিকতা ও গুণের ওপর ভিত্তি করে তাঁদের ৪ ভাগে ভাগ করা হয়েছে:
- দিব্যাচারী সাধক (সত্ত্বগুণসম্পন্ন): ইাঁরা কোনো রক্তপাত ছাড়াই কেবল সাধনার জোরে রিপু দমন করেন।
- কামের বদলে প্রেম
- ক্রোধের বদলে ক্ষমা
- লোভের বদলে ত্যাগ
- মোহের বদলে আসক্তিহীনতা
- মদের বদলে নিরহঙ্কার
- মাৎসর্যের বদলে অহিংসা
- বীরাচারী সাধক (সত্ত্ব ও রজঃগুণসম্পন্ন): ইাঁদের সাধনায় শারীরিক বলের প্রয়োজন হয়, তাই ইাঁরা ঘাতবলি দেন।
- কামের স্থানে ছাগল (পাঁঠা)
- क्रोधের স্থানে মহিষ
- লোভের স্থানে মেষ (ভেড়া)
- মোহের স্থানে হাঁস
- মদের স্থানে বরাহ (শুয়োর)
- মাৎসর্যের স্থানে মোরগ
- দক্ষিণাচারী সাধক (রজঃ ও তমোগুণসম্পন্ন): ইাঁরা ফলের মাধ্যমে ঘাতবলি নিবেদন করেন।
- কামে চালকুমড়ো, ক্রোধে শসা, লোভে কলা, মোহে সুপারি, মদে বাতাবি লেবু, মাৎসর্যে আখ।
- পশ্বাচারী সাধক (তমোগুণসম্পন্ন): সাধারণ মানুষ এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। ইাঁদের জন্য অ-ঘাত বলি বা উৎসর্গের বিধান রয়েছে।
- কামে আতপ চাল, ক্রোধে গাওয়া ঘি, লোভে গরুর দুধ, মোহে মধু, মদে চিনি, মাৎসর্যে গোটা ফল।
৪. দুর্গা কেন ‘বলিপ্রিয়া’?
দুর্গাপুজো হলো মহাপুজো, যা ৪টি প্রধান ধাপে সম্পন্ন হয়— স্নপন (স্নান), পূজন, হবন (যজ্ঞ) এবং বলিদান। কালিকা পুরাণে বলা হয়েছে, ভগবান শিবের প্রিয় অভিষেক, গণেশের প্রিয় মোদক, আর দেবী দুর্গা হলেন ‘বলিপ্রিয়া’। তবে বলির আগে পশুটিক চণ্ডী রূপ ও শিবশক্তি জ্ঞান করে শাস্ত্রীয় মন্ত্রে পুজো করার নিয়ম রয়েছে।
৫. বলির মাংস ও ‘বৃথা মাংস’
বাঙালি রবিবারে যে মাংস খায়, শাস্ত্রীয় দৃষ্টিতে নিবেদিত না হলে তা ‘বৃথা মাংস’। অতীতে উৎসবে বলি হওয়া প্রসাদী মাংস দিয়ে ভুড়িভোজের প্রথা ছিল। এমনকি সারদা মা-ও দোকান থেকে কেনা কাঁচা মাংসকে ‘বৃথা মাংস’ বলে কালীঘাটের বলির প্রসাদী মাংস খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ১৯ শতকে কলকাতায় কেবল প্রসাদী মাংস বিক্রি করার জন্য ছোট ছোট কালী মূর্তি গড়ে ওঠার ইতিহাসও রয়েছে।
শাস্ত্র ঘেঁটে স্পষ্ট বোঝা যায়, শক্তিপুজোয় বলিদান কোনো নির্মম অশাস্ত্রীয় প্রথা নয়; বরং এর সাথে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের দৃষ্টিভঙ্গি, চরিত্র সংশোধন ও আধ্যাত্মিক ত্যাগের গভীর ব্যাখ্যা।