ফ্রান্সে স্কুল পড়ুয়াদের তাণ্ডব: জেন-জি’কে পেছনে ফেলে পথে নামল ‘জেন-আলফা’, দিশেহারা ম্যাক্রোঁ সরকার

১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই বাস্তিল দুর্গের পতনের মধ্যে দিয়ে বিশ্বকে গণবিপ্লবের পাঠ দিয়েছিল ফ্রান্স। আর ২০২৬ সালে এসে সেই ফ্রান্সে জন্ম নিয়েছে এক নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদ, যা দেখে কপালে হাত পড়েছে খোদ সরকারের। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন জেন-জি (Gen-Z) প্রজন্মকে সামলাতে ব্যস্ত, তখন ফ্রান্সে আন্দোলনের ব্যাটন ধরেছে একেবারে কমবয়সী স্কুল পড়ুয়ারা— যাকে বলা হচ্ছে ‘জেন-আলফা’ (Gen Alpha)।
ফ্রান্সজুড়ে মাধ্যমিক স্তরের স্কুল পড়ুয়াদের এই আন্দোলন রূপ নিয়েছে ভয়ংকর তাণ্ডবে। দেশটির মোট ৩,৭০০টি মাধ্যমিক স্কুলের মধ্যে প্রায় ৫০০টি এমনভাবে ভাঙচুর করা হয়েছে যে সেগুলির পড়াশোনার পরিবেশ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। শহরের পর শহরে আগুন, দোকানপাটে ভাঙচুর এবং ব্যাপক সম্পত্তিহানির অভিযোগে ইতিমধ্যেই ২ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পরিস্থিতি এতটাই হাতের বাইরে চলে গেছে যে ড্যামেজ কন্ট্রোল বা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছে না ফরাসি প্রশাসন।
ছাত্রদের ক্ষোভের কারণ কী? শিক্ষার্থীদের এই হঠাৎ বিস্ফোরণের পেছনে রয়েছে বেশ কিছু বাস্তব সমস্যা। তাদের প্রধান অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে—
- দীর্ঘ সিলেবাস ও শিক্ষক সংকট: সিলেবাস দীর্ঘ হলেও তা শেষ করার সময় কম এবং পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব রয়েছে।
- ভিড়ের ক্লাস: প্রতিটি ক্লাসে ৩০ থেকে ৪০ জন করে অতিরিক্ত পড়ুয়া গিজগিজ করছে।
- খারাপ পরিকাঠামো ও খাবার: স্কুলগুলির অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামো এবং মিড ডে মিলের মান অত্যন্ত নিম্নমানের।
- তাপপ্রবাহের কবলে স্কুল: ইউরোপে চলা মারাত্মক তাপপ্রবাহ মোকাবিলার ন্যূনতম ব্যবস্থা নেই স্কুলগুলিতে।
- ভর্তির জটিলতা: কলেজে ভর্তির অনলাইন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে।
সমস্যা কি কেবল ফ্রান্সেরই? এই সমস্যাগুলোর কিছু পরিচিত রূপ আমাদের দেশেও রয়েছে। যেমন— পর্যাপ্ত শিক্ষক বা পরিকাঠামোর অভাব। তবে ভারতে একটি ক্লাসে ৪০ জন ছাত্র থাকাকে স্বাভাবিক বলে মনে করা হলেও, ইউরোপের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা। বিশেষ করে এবারের তীব্র গরমে ইউরোপের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু আসল বিপদ লুকিয়ে অন্য জায়গায়।
ফরাসি ছাত্র সংগঠনগুলি এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। আর এর পেছনে রয়েছে এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট। ফ্রান্সে জন্মহার কম হওয়া সত্ত্বেও ক্লাসে পড়ুয়ার সংখ্যা আচমকা হু হু করে বাড়ছে কীভাবে?
এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে অভিবাসী সংকটে। অতীতে সিরিয়ার শরণার্থীদের জন্য ইউরোপের দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। যার জেরে ধীরে ধীরে বদলে গেছে ইউরোপের সমাজবিন্যাস। এর সুযোগ নিয়ে দেশগুলিতে মাথা তুলছে অতি-ডানপন্থী শক্তিগুলি। সাধারণ মানুষকে বোঝানো হচ্ছে যে, শরণার্থীদের কারণেই তরুণ প্রজন্মের পাতে খাবার কম পড়ছে, স্কুলগুলিতে ঠিকমতো পরিষেবা মিলছে না।
ইতালির সরকার ইতিমধ্যেই ক্লাসে বিদেশি পড়ুয়ার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সের স্কুল পড়ুয়াদের এই বিক্ষোভ নিছক কোনো ছোটখাটো ছাত্র আন্দোলন নয়; বরং এটি আগামী দিনে ইউরোপজুড়ে অভিবাসী বিরোধী এবং এক বিরাট সামাজিক পরিবর্তনের আশু ইঙ্গিত। ছোট ছোট এই প্রতিবাদের নদীগুলিই কি তবে ভবিষ্যতে কোনো মহা বিপ্লবের সাগরে গিয়ে মিলবে? পরিস্থিতি দেখে অন্তত তেমনই আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।