দাড়ি কেটে রূপ বদলেও শেষরক্ষা হলো না! দিল্লি বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার বর্ধমানের শিশুমৃত্যু কাণ্ডে অভিযুক্ত ভুয়ো চিকিৎসক সায়দুল

পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিতে নিজের চিরপরিচিত একগাল দাড়ি-গোঁফ কেটে সম্পূর্ণ রূপ বদলে ফেলেছিল সে। তবে তাতেও শেষরক্ষা হলো না। বর্ধমানের নার্সিংহোমে চার বছরের শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত ভুয়ো চিকিৎসক শেখ সায়দুল হক শেষপর্যন্ত পুলিশের জালে ধরা পড়ল। মঙ্গলবার দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে দিল্লি পুলিশ। স্ত্রীকে নিয়ে দুবাইয়ে গা-ঢাকা দেওয়ার চূড়ান্ত পরিকল্পনার সময়ই হাতেনাতে ধরা পড়ে যায় সে।
ঘটনার নেপথ্য ও ভুয়ো ডিগ্রির জাল
গত ২ সেপ্টেম্বর বর্ধমানের একটি নার্সিংহোমে ফাইমোসিস অস্ত্রোপচারের পর চার বছরের শিশু অরণ্য রায়ের করুণ মৃত্যু হয়। ওই অপারেশনের দায়িত্বে ছিল সায়দুল। ঘটনার তদন্ত শুরু হতেই প্রকাশ্যে আসে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা যায়, বিহার থেকে ডাক্তারির ভুয়ো শংসাপত্র জোগাড় করে এবং প্রভাবশালীদের কাজে লাগিয়ে বেআইনি রেজিস্ট্রেশন নম্বর আদায় করেছিল সায়দুল। গত ১৫ সেপ্টেম্বর ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিল সায়দুলসহ পাঁচজন ভুয়ো চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করে এবং কলকাতার বিধাননগর দক্ষিণ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়।
পলায়ন ও দুবাই পালানোর চক্রান্ত
অভিযোগ উঠতেই রাতারাতি উধাও হয়ে যায় সায়দুল। তাকে খুঁজতে গত ২৩ সেপ্টেম্বর ‘লুক আউট নোটিস’ জারি করে পুলিশ। তদন্তে জানা গিয়েছে, বর্ধমানের নবাবহাটের এক নার্সিংহোম মালিকের সহায়তায় সায়দুল প্রথমে বাংলাদেশে পালানোর ছক কষেছিল। কিন্তু ভিসা জটিলতায় পরিকল্পনা বদলে ‘ভিসা অন অ্যারাইভাল’ নিয়ে দুবাই চলে যায় এবং সেখানে ২৮ দিন কাটায়।
দুবাইয়ে থাকলেও সে টানা যোগাযোগের মধ্যে ছিল স্ত্রী অলিভিয়া খাতুনের সঙ্গে। পুলিশি নজরদারি এড়াতে নার্সিংহোমের কর্মচারীদের আধার কার্ড ব্যবহার করে বারবার সিম কার্ড বদলে কথা বলত তারা। তবে জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর কড়া পদক্ষেপ নিয়ে সায়দুলের যুক্ত থাকা নার্সিংহোমটি বন্ধ করে দেয়, তার স্ত্রীর অংশীদারিত্ব বাতিল করে এবং নার্সিংহোমের দুই মালিককে গ্রেপ্তার করে। এরপর স্ত্রীকে নিয়ে দুবাইয়ে চিরতরে থিতু হওয়ার উদ্দেশ্যে দিল্লিতে এসে পৌঁছায় সায়দুল, আর সেখানেই বিমানবন্দরে ওত পেতে থাকা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে।
পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ ও পরিবারের প্রতিক্রিয়া
দিল্লি পুলিশ সায়দুলকে গ্রেপ্তার করার পর বর্ধমান থানার একটি বিশেষ প্রতিনিধি দল তাকে ট্রানজ়িট রিমান্ডে আনতে দিল্লিতে পৌঁছায়। বুধবার তাকে বর্ধমান আদালতে হাজির করা হবে।
সায়দুলের গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মৃত শিশু অরণ্যর মা শিল্পা রায়। উল্লেখ্য, সন্তানকে হারানোর পর তাঁকেও ফোনে হুমকি ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল, যে ঘটনায় ইতিমধ্যেই হুগলি থেকে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। স্বস্তি প্রকাশ করে শিল্পা রায় বলেন, “চেয়েছিলাম আমার মতো আর কোনো মায়ের কোল যেন খালি না হয়। পুলিশকে ধন্যবাদ জানাই। আইনের পথে এবার যেন ওই ভুয়ো চিকিৎসকের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়।”