‘বাবার পরিচয় দিতে না পারলেই কি বাংলাদেশি?’ ডিটেনশন সেন্টার বিতর্কে বিস্ফোরক বিচারপতি

বৈধ আধার এবং প্যান কার্ড বাতিল না করেই কি কাউকে স্রেফ সন্দেহের বশে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো যায়? নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত এক গুরুত্বপূর্ণ মামলায় রাজ্য পুলিশ এবং এফআরআরও (FRRO)-র ভূমিকা নিয়ে এভাবেই তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করল কলকাতা হাইকোর্ট।
মামলার শুনানিতে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য ৭০-এর দশকে বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষদের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে প্রশ্ন করেন, “১৯৭০-এর দশকে ঠিক কত মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে এসেছিলেন? এত দশক পর কি তাঁদের সবাইকে চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানো সম্ভব?”
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও অতিসক্রিয়তার কড়া সমালোচনা করে বিচারপতি আরও বলেন, কেউ যদি পুলিশের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে নিজের পিতার পরিচয় বা সম্পর্ক প্রমাণ করতে না পারেন, তবেই কি তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশি হয়ে যাবেন? কে প্রকৃত ভারতীয় আর কে বেআইনিভাবে প্রবেশ করেছেন, তা চূড়ান্ত করার ভার কি কেবল পুলিশের ওপরই ন্যস্ত? আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, কাউকে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো বা নির্বাসিত করার মতো চরম পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তাঁর সমস্ত আইনি নথিপত্র যথাযথভাবে যাচাই করা কর্তৃপক্ষের আবশ্যিক কর্তব্য।
ঘটনার সূত্রপাত গত ৮ অগস্ট। মুর্শিদাবাদের রানিনগর থানার পুলিশ এক ব্যক্তিকে বাংলাদেশি সন্দেহে গ্রেফতার করে এবং উপযুক্ত আইনি সুযোগ না দিয়েই মাত্র দু’দিনের মাথায় (১০ অগস্ট) তড়িঘড়ি তাঁকে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠিয়ে দেয়। পুলিশের এই অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার চেয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় ওই ব্যক্তির পরিবার।
রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল (AAG) রাজদীপ মজুমদার পুলিশের পদক্ষেপের সমর্থনে আদালতে দাবি করেন, ভুয়ো নথি ব্যবহার করে এ দেশে বসবাসকারী একাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে এবং ধৃতকে যথাযথ জিজ্ঞাসাবাদের পরেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, সমগোত্রীয় একাধিক মামলা অন্য ডিভিশন বেঞ্চে বিচারাধীন রয়েছে।
উভয় পক্ষের সওয়াল-জবাব ও নথিপত্র খতিয়ে দেখার পর বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য জানান, এই মামলাটি বর্তমানে তাঁর এজলাসের এক্তিয়ারভুক্ত নয়। তিনি মামলাটি ছেড়ে দেন এবং দ্রুত উপযুক্ত এক্তিয়ারভুক্ত বেঞ্চে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তবে বিচারপতির এই নজিরবিহীন পর্যবেক্ষণ পুলিশি পদক্ষেপ ও নাগরিকত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে আইনি মহলে বড়সড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।