দুই মাস হইছে, মাছের গন্ধটাই ভুইল্যা গেছি!

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি: দিশেহারা পোশাক শ্রমিকদের কণ্ঠে মজুরি বৃদ্ধির দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক:
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে পিষ্ট হয়ে বাংলাদেশের পোশাক খাতের শ্রমিকরা এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছেন। ঢাকা ও আশুলিয়া অঞ্চলের পোশাক শ্রমিকদের অভিযোগ, গত এক বছরে তাদের জীবনযাত্রার খরচ দেড়গুণ বাড়লেও সেই তুলনায় আয় বাড়েনি। ফলে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে জোরালো আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
আশুলিয়ার জিরাবোসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জীবনযাত্রার ব্যয়ে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। শ্রমিকদের ভাষ্যমতে, এক বছর আগে যে বিদ্যুৎ বিল ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা বর্তমানে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকায় ঠেকেছে। একইভাবে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় অনেক শ্রমিক রান্নার জ্বালানি হিসেবে পুনরায় মাটির চুলার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
শ্রমিকদের অভিযোগ, বর্তমানে অধিকাংশ শ্রমিকের আয়ের একটি বড় অংশই চলে যাচ্ছে বাসা ভাড়া ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধে। মাসের ১০ তারিখের মধ্যেই বেতন শেষ হয়ে যাওয়ায় অবশিষ্ট দিনগুলো তাদের চরম সংকটে কাটাতে হয়। অনেক শ্রমিক মুদি দোকান থেকে বাকিতে পণ্য কিনে মাস পার করছেন। টুটুল মোল্লা নামের এক শ্রমিক বলেন, “বেতন যা পাই, তাতে দুই বেলা খাবারই কষ্টকর। মাছ-মাংসের স্বাদ এখন স্মৃতি হয়ে গেছে।”
বর্তমানে পোশাক শিল্পে সর্বনিম্ন মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা ২০২৩ সালের নভেম্বরে নির্ধারণ করা হয়েছিল। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এই টাকায় সংসার চালানো আসাম্ভব হয়ে পড়ায় শ্রমিকরা নতুন মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম বেতনের দাবি জানিয়েছেন। মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান অস্থিরতার কারণে গত কয়েকদিন ধরে কারখানাগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে দু-তিন ঘণ্টার মধ্যেই কারখানা ছুটি দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, শ্রমিকদের এই আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠার পর সরকারের পক্ষ থেকে মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং মজুরি বৃদ্ধির আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, সরকারের একটি অংশ এই আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ তুললেও, তৃণমূল পর্যায়ের শ্রমিকরা একে নিছক ‘জীবন বাঁচানোর লড়াই’ হিসেবেই দেখছেন।
অনেক শ্রমিকের মতে, “জিনিসপত্রের দাম সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনলে বাড়তি বেতনের প্রয়োজন পড়তো না।” কিন্তু নিত্যপণ্যের অগ্নিমূল্য তাদের রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে বলে তারা জানিয়েছেন। বর্তমানে সরকার ও মালিকপক্ষের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন হাজার হাজার পোশাক শ্রমিক, যাদের এখন একটাই প্রত্যাশা—দ্রব্যমূল্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ আয়।