১০২ বছরের বৃদ্ধার নামও বাদ! স্বাধীনতার পর প্রথমবার ভোট দিয়ে এখন ব্রাত্য!

১০২ বছরের বৃদ্ধার নামও বাদ! স্বাধীনতার পর প্রথমবার ভোট দিয়ে এখন ব্রাত্য!

আরামবাগ, হুগলি

পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার আরামবাগে ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে, যা নিয়ে বর্তমানে রাজ্য রাজনীতি সরগরম। আরামবাগের মায়াপুর-১ পঞ্চায়েতের মালিপুকুর এলাকার ১৫৮ নম্বর বুথে ১১০ জন ভোটারের নাম আচমকাই ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ বা বিচারাধীন তালিকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনার সবথেকে চাঞ্চল্যকর দিক হলো, খোদ বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও) এবং তাঁর ১০২ বছর বয়সী বৃদ্ধা মায়ের নামও সেই তালিকায় রয়েছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও বিএলও-র আক্ষেপ

২০১১ সাল থেকে নিষ্ঠার সঙ্গে বিএলও-র দায়িত্ব পালন করছেন মুনিরুদ্দিন মল্লিক। তাঁর বুথে মোট ৬০০ জন ভোটার রয়েছেন, যার মধ্যে ১১০ জনের নাম বর্তমানে মূল তালিকা থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে। মুনিরুদ্দিন বাবু অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে জানিয়েছেন, তাঁর মা ১০২ বছরে পা দিয়েছেন এবং স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম ভোটার তালিকায় তাঁর নাম ছিল। সারাজীবন ভোটাধিকার প্রয়োগ করার পর আজ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁকে নিজের নাগরিকত্বের প্রমাণের জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। এমনকি মুনিরুদ্দিন বাবুর নিজের এবং তাঁর পরিবারের ৭ সদস্যের নামও বর্তমানে ‘বিচারাধীন’ অবস্থায় রয়েছে।

ভোটারদের ক্ষোভ ও প্রশাসনিক প্রশ্ন

আক্রান্ত ভোটারদের দাবি, তাঁদের কাছে পাসপোর্ট, আধার কার্ড এবং ভোটার কার্ডের মতো সমস্ত বৈধ নথি থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁদের নাম মূল তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলো? তাঁরা আরও জানিয়েছেন যে, নির্বাচন কমিশনের নিয়ম মেনে শুনানিতেও (Hearing) তাঁরা হাজিরা দিয়েছিলেন। তবুও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই বুথের ভোটারদের কেন লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, তা নিয়ে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, সরকারি নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও যদি দীর্ঘদিনের স্থায়ী বাসিন্দাদের নাম বাদ যায়, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?

তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা

এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি-র মধ্যে রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুড়ি শুরু হয়েছে। শাসক দল তৃণমূলের নেতা স্বপন নন্দীর সরাসরি অভিযোগ, বিজেপি-র ইশারায় একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষকে হেনস্তা করতেই পরিকল্পিতভাবে এই কাজ করা হয়েছে। সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে থাবা বসাতেই প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে এই চাল চালছে গেরুয়া শিবির।

পাল্টা জবাবে স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক মধুসূদন বাগ এই সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, বিএলও থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক আধিকারিক— প্রত্যেকেই রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন। ফলে ভোটার তালিকায় এই ধরণের বড় ভুল বা বিচ্যুতি আসলে প্রশাসনেরই চূড়ান্ত ব্যর্থতা এবং এর দায় রাজ্য সরকারকেই নিতে হবে।

১০২ বছরের বৃদ্ধা থেকে শুরু করে খোদ সরকারি আধিকারিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে ছিটকে যাওয়ায় গোটা আরামবাগ জুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন— এটি কি নিছকই যান্ত্রিক ত্রুটি নাকি পর্দার আড়ালে রয়েছে গভীর কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *