১০৭৫ বন্দি, মৃত্যুও অনেকের, ভোটের মুখে বাংলার জেলখানায় দুর্বিষহ পরিস্থিতি নিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি হাইকোর্টের

১০৭৫ বন্দি, মৃত্যুও অনেকের, ভোটের মুখে বাংলার জেলখানায় দুর্বিষহ পরিস্থিতি নিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি হাইকোর্টের

পশ্চিমবঙ্গের জেল বা সংশোধনাগারগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বন্দি থাকা থেকে শুরু করে বন্দিমৃত্যুর ক্রমবর্ধমান হার—সব মিলিয়ে এক বীভৎস চিত্র উঠে এসেছে কলকাতা হাইকোর্টে। বিচারপতি দেবাংশু বসাক ও বিচারপতি সব্বার রশিদির ডিভিশন বেঞ্চ এই বিষয়ে রাজ্যের গা-ছাড়া মনোভাব দেখে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, ভোটের কারণে জরুরি পরিষেবা বা বন্দিদের মানবাধিকার উপেক্ষা করা যাবে না।

জেলে বন্দিমৃত্যুর আতঙ্কজনক পরিসংখ্যান

রাজ্যের সংশোধনাগারগুলোতে বন্দিমৃত্যুর হার সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী:

  • ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে রাজ্যে ৯০৫ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে।
  • পরবর্তী তিন বছরে মৃতের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৫২, ১৩৮ এবং ১৪৩ জন।
  • চলতি বছরের শুধুমাত্র জানুয়ারি মাসেই ১৩ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে।

মালদা জেলা সংশোধনাগারের উদাহরণ টেনে আদালত দেখিয়েছে, যেখানে ৩৫৩ জন থাকার কথা, সেখানে বর্তমানে ১০৭৫ জন বন্দি গাদাগাদি করে থাকছেন। এই উপচে পড়া ভিড় বন্দিদের নূন্যতম জীবনযাত্রার মানকে তলানিতে ঠেকিয়েছে।

চিকিৎসক ও কর্মীর অভাব এবং প্রশাসনিক উদাসীনতা

জেলে বন্দিদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত লোকবল নেই। রাজ্যের ৬১টি সংশোধনাগারের জন্য অনুমোদিত ৩০টি মেডিকেল অফিসারের পদের মধ্যে ২৮টিই দীর্ঘকাল ধরে শূন্য। এছাড়া কারাকর্মীদের জন্য বরাদ্দ ৪৭৮৯টি পদের মধ্যে ১৪৬৭টি পদ খালি পড়ে আছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে এই দীর্ঘসূত্রতা এবং উদাসীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ক্ষতিপূরণ নিয়ে সরকারের অনাগ্রহ

২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্ট এবং ২০১৮ সালে কলকাতা হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল যে, জেলে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় বন্দির পরিবারকে ন্যূনতম ৩ লক্ষ টাকা অন্তর্বর্তী ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, রাজ্য সরকার এই আইনি বাধ্যবাধকতা পালনে চূড়ান্ত অনীহা দেখাচ্ছে। বুধবার শুনানির সময় সরকারি আইনজীবীর অনুপস্থিতি বা বারবার আইনজীবী বদলে যাওয়ার ঘটনায় বিচারপতিরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

আদালতের কঠোর হুঁশিয়ারি ও রোডম্যাপ তলব

রাজ্য সরকার ভোটের দোহাই দিয়ে শুনানির সময় পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করলে আদালত তা খারিজ করে দেয়। বিচারপতি বসাক প্রশ্ন করেন, ভোটের জন্য কি জেলবন্দিদের অধিকার নষ্ট হতে থাকবে? তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি বন্দিদের উপচে পড়া ভিড় কমানোর ব্যবস্থা না হয়, তবে আদালত বন্দিদের জামিন দেওয়ার নির্দেশ জারি করবে।

আদালত আগামী ২২ এপ্রিলের মধ্যে সরকারের কাছে তিনটি বিষয়ে সুস্পষ্ট জবাব চেয়েছে:

১. জেলে বন্দিদের ভিড় কমাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?

২. অস্বাভাবিক মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ প্রদানের বর্তমান স্থিতি কী?

৩. শূন্যপদগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়া কত দিনে শেষ করা হবে?

একঝলকে

  • মালদা জেলে ধারণক্ষমতার তিন গুণ বেশি বন্দি বর্তমান।
  • গত কয়েক বছরে রাজ্যে বন্দিমৃত্যুর সংখ্যা ১০০০ ছাড়িয়েছে।
  • ৩০টি মেডিকেল অফিসার পদের মধ্যে ২৮টিই শূন্য।
  • কারাকর্মীদের প্রায় ১৫০০ পদ খালি পড়ে আছে।
  • আগামী ২২ এপ্রিলের মধ্যে সরকারকে নিয়োগ ও ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত রোডম্যাপ দিতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *