ভূ-রাজনীতির দাবার চাল: কার হাতে কয়টি তুরুপের তাস? ইরান-আমেরিকা সংঘাত ও বিশ্ব বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ

ভূ-রাজনীতির দাবার চাল: কার হাতে কয়টি তুরুপের তাস? ইরান-আমেরিকা সংঘাত ও বিশ্ব বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ

পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার আবহে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে এক স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাকির গালিবফের সাম্প্রতিক দাবি অনুযায়ী, ইরান বর্তমানে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে কারণ তাদের হাতে এখনও বেশ কয়েকটি ‘তুরুপের তাস’ অবশিষ্ট আছে, যেখানে আমেরিকা তার প্রায় সব শক্তি নিঃশেষ করে ফেলেছে।

নিচে দুই পক্ষের রণকৌশল ও সম্ভাব্য বিশ্ব সংকটের একটি চিত্র তুলে ধরা হলো:

ইরানের হাতে থাকা তিনটি প্রধান তাস

ইরান তার ভৌগোলিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য স্থবির করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

  • তুরুপের তাস ১: হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। ইরান বর্তমানে এখান দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে শুল্ক আদায় করছে। গালিবফের মতে, ইরান চাইলে এই পথটি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে, যা এখনও তারা করেনি। এটি করা হলে বিশ্ব তেলের বাজারে হাহাকার পড়ে যাবে।
  • তুরুপের তাস ২: বাব আল-মানদেব (Bab al-Mandeb) হুথিদের মাধ্যমে ইরান এই পথটি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে। লোহিত সাগরের এই প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দিলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সামুদ্রিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
  • তুরুপের তাস ৩: তেল পাইপলাইন ও এশীয় সরবরাহ ইরান এই অঞ্চলের তেল সরবরাহকারী প্রধান পাইপলাইনগুলো বন্ধ করার পরিকল্পনা করছে। এর ফলে বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোতে তেল সরবরাহ সম্পূর্ণ ব্যাহত হবে। গালিবফের দাবি, এই তাসটি ইরান এখনও ব্যবহার করেনি।

আমেরিকার ‘নিঃশেষিত’ শক্তি

গালিবফের দাবি অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন আমেরিকা তার হাতে থাকা প্রধান দুটি তাস ইতিমধ্য়েই খেলে ফেলেছে এবং সেগুলি বর্তমানে অকার্যকর।

  1. তেলের মজুত (Strategic Petroleum Reserve): বাজারে তেলের ঘাটতি মেটাতে আমেরিকা তার মজুত তেলের সিংহভাগ ব্যবহার করে ফেলেছে। এখন নতুন করে তেল উত্তোলনের বা ব্যবহারের সুযোগ তাদের হাতে খুব কম।
  2. চাহিদা কমানোর কৌশল: সরবরাহ ঘাটতি রুখতে আমেরিকা তেলের বিশ্বব্যাপী চাহিদা কমানোর যে চেষ্টা করেছিল, তা ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবি ইরানের।

‘কেপ অফ গুড হোপ’ এবং রাশিয়ার ভূমিকা: ইরানের নতুন নীল নকশা

ইরান শুধুমাত্র লোহিত সাগর বা হরমুজ প্রণালীতে থেমে নেই। তারা বিকল্প জলপথগুলোও বন্ধ করার দূরপাল্লার পরিকল্পনা করছে।

  • রাশিয়া-মাদাগাস্কার অক্ষ: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বর্তমানে রাশিয়ায় রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, পুতিনের সহযোগিতায় ইরান আফ্রিকার ‘কেপ অফ গুড হোপ’ জলপথটি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
  • মাদাগাস্কারের গুরুত্ব: ২০২৫ সালের অভ্যুত্থানের পর মাদাগাস্কারের বর্তমান রাষ্ট্রপতি কর্নেল মাইকেল রান্দ্রিয়ানিরিনার সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক অত্যন্ত দৃঢ়। মাদাগাস্কারকে ব্যবহার করে এই বিকল্প পথটি বন্ধ করতে পারলে এশিয়া, আরব ও ইউরোপের মধ্যে সমস্ত সামুদ্রিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
  • সোমালিয়ার আল-শাবাব: আদর্শগত অমিল থাকলেও ইরান হুথিদের মাধ্যমে সুন্নি গোষ্ঠী আল-শাবাবকে অস্ত্র সরবরাহ করছে বলে খবর। তারা সোমালি উপকূলে তেল ট্যাঙ্কার দখল করে চাপ সৃষ্টির কৌশল নিচ্ছে।

ফলাফল: বিশ্ব বাণিজ্যে মহাপ্রলয়?

যদি ইরান সফলভাবে হরমুজ প্রণালী, বাব আল-মানদেব এবং কেপ অফ গুড হোপ—এই তিনটি পথই বন্ধ করে দিতে পারে, তবে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ:

  • বাণিজ্য স্থবিরতা: ইউরোপের সাথে এশিয়া ও আরব দেশগুলোর সরাসরি বাণিজ্যিক লেনদেন পুরোপুরি থেমে যাবে।
  • অর্থনৈতিক ধস: বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা কল্পনা করাও কঠিন। এর ফলে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি ও খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।

ইরানের বার্তা পরিষ্কার—যদি ট্রাম্প প্রশাসন অবরোধ না তোলে, তবে তারা তাদের অবশিষ্ট তাসগুলো একে একে খেলতে শুরু করবে। যার মাশুল গুনতে হতে পারে গোটা বিশ্বকে।

প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছেন স্বাধীন মানব দাস।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *