শিক্ষায় ‘খাড়া পিরামিড’ সংকট: স্কুলছুটে দিশেহারা ৪০%, শূন্য ছাত্রের স্কুলে দেশসেরা বাংলা!

শিক্ষায় ‘খাড়া পিরামিড’ সংকট: স্কুলছুটে দিশেহারা ৪০%, শূন্য ছাত্রের স্কুলে দেশসেরা বাংলা!

ভারতীয় স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থার পরিকাঠামো নিয়ে সম্প্রতি এক উদ্বেগজনক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে নীতি আয়োগ। ‘স্কুল এডুকেশন সিস্টেম ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক দশ বছরের এই বিশ্লেষণে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি ‘খাড়া পিরামিড’-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। রিপোর্টে দেখা গেছে, প্রাথমিক স্তরে ছাত্রছাত্রীদের ভিড় থাকলেও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৪ জনই দ্বাদশ শ্রেণি শেষ করার আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে।

পরিকাঠামোগত বিচ্ছিন্নতা ও স্কুলছুটের কারণ

নীতি আয়োগের মতে, এই সংকটের মূলে রয়েছে স্কুলের পরিকাঠামোগত অসামঞ্জস্য। দেশে বর্তমানে প্রায় ৭.৩ লক্ষ প্রাথমিক স্কুল থাকলেও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা মাত্র ১.৬৪ লক্ষ। দেশের মাত্র ৫.৪ শতাংশ স্কুলে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্ন পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। এর ফলে গ্রামগঞ্জের শিক্ষার্থীদের এক স্কুল থেকে অন্য স্কুলে যাওয়ার পথে লিঙ্কেজ বা যোগসূত্রের অভাব ঘটছে, যা তাদের মাঝপথে পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য করছে। বিশেষ করে স্থানীয় স্তরে উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের অভাব এই ‘ড্রপ আউট’ সমস্যার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শূন্য পড়ুয়ার স্কুলে শীর্ষে পশ্চিমবঙ্গ

রিপোর্টের সবথেকে চাঞ্চল্যকর দিক হলো ‘শূন্য পড়ুয়া’র স্কুলের সংখ্যা। সারা দেশে ৭,৯৯৩টি স্কুলে বর্তমানে একজনও শিক্ষার্থী নেই, যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা সবথেকে শোচনীয়। রাজ্যে ৩,৮১২টি স্কুলে কোনও ছাত্রছাত্রী নেই, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। তালিকায় এর পরেই রয়েছে তেলঙ্গানা (২,২৪৫)। প্রশাসনিক নথিতে এই স্কুলগুলো সচল দেখালেও বাস্তবে পঠনপাঠন বন্ধ। অথচ নথিবদ্ধ রেকর্ড আপডেট না হওয়ায় এই স্কুলগুলোর জন্য নিয়মিত সরকারি অর্থ ও মানবসম্পদ বরাদ্দ হয়ে চলেছে, যা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

মেধার মান ও ভবিষ্যতের প্রভাব

কেবল স্কুলছুট নয়, শিক্ষার গুণগত মান নিয়েও নীতি আয়োগ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গত দশ বছরে অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়াদের পড়ার দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০১৪ সালে যেখানে ৭৪.৭ শতাংশ পড়ুয়া দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠ্য অনায়াসে পড়তে পারত, ২০২৪ সালে সেই হার কমে ৭১.১ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ, ভর্তির হার বাড়লেও প্রকৃত শিখন পদ্ধতিতে বড়সড় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি বজায় থাকলে একদিকে যেমন দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ব্যাহত হবে, অন্যদিকে উচ্চশিক্ষার ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে। শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণ না হলে ভারতের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গভীর সংকটে পড়বে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে এই রিপোর্ট।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *