সমাজ সংস্কারের নামে কেড়ে নেওয়া যাবে না ধর্মীয় স্বাধীনতা! সবরিমালা মামলায় কড়া পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের

সমাজ সংস্কারের নামে কেড়ে নেওয়া যাবে না ধর্মীয় স্বাধীনতা! সবরিমালা মামলায় কড়া পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের

ভারতের কেরলের শবরীমালা মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানে নারীদের প্রবেশাধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিধি নিয়ে চলা এক গুরুত্বপূর্ণ শুনানিতে কড়া পর্যবেক্ষণ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের নয় সদস্যের বৃহত্তর সাংবিধানিক বেঞ্চ। সোমবার শুনানিকালে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, সমাজ সংস্কারের নামে সংবিধানপ্রদত্ত ধর্মীয় স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার কোনোভাবেই খর্ব করা যাবে না।

সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষা

প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই শুনানিতে মন্তব্য করেন যে, সংবিধান প্রণেতারা সামাজিক প্রয়োজনীয়তা এবং সুসভ্য সমাজের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই আইনগুলো তৈরি করেছিলেন। আদালতের মতে, নয় সদস্যের এই বেঞ্চও সেই মৌলিক সাংবিধানিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে না। বিচারপতি বি. ভি. নাগরত্ন শুনানির এক পর্যায়ে বলেন, সংবিধানের ২৫(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিক যে ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করেন, সমাজ সংস্কারের অজুহাতে তা কেড়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

যুক্তি ও পাল্টাযুক্তি

কেরল সরকারের পক্ষ থেকে আইনজীবী জয়দীপ গুপ্ত আদালতে সওয়াল করেন যে, ধর্মের মূল উপাদানগুলোকে সংস্কারের নামে শেষ করে দেওয়া যায় না। হিন্দু ধর্মে উপাসনার অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি পবিত্র স্থানের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে, প্রবীণ আইনজীবী বিজয় হংসারিয়া শবরীমালা মন্দিরে ঋতুচক্রের বয়সে থাকা নারীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গটি সামনে আনলে বিচারপতি নাগরত্ন জানান, এটি সম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বিষয় এবং ভক্তরা এটিকে কীভাবে দেখছেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

আদালতে সঞ্জয় হেগড়ে এবং মেনকা গুরুস্বামীর মতো আইনজীবীরা বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা ও সংস্কারপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরলেও, বেঞ্চ সংবিধানের মূল কাঠামোর ওপর জোর দেয়। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত উল্লেখ করেন, যদি জনগণ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে কোনো সংস্কার চায়, তবে আদালত তা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু চাপিয়ে দেওয়া হলে আদালত তাতে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য।

প্রেক্ষাপট ও প্রভাব

২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের ৫ সদস্যের বেঞ্চ ৪:১ সংখ্যাধিক্য ভোটে ১০ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের শবরীমালা মন্দিরে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিল। বর্তমান শুনানিটি সেই রায় পরবর্তী উদ্ভূত বিভিন্ন আইনি ও ধর্মীয় প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। বুধবার এই মামলার পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এই রায়ের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হবে ভারতের বিভিন্ন ধর্মের অভ্যন্তরীণ প্রথা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মধ্যেকার আইনি সীমারেখা, যা ভবিষ্যতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *