জ্বালানির আগুনে পুড়ছে পকেট, শনিবার দেশজুড়ে সুইগি-জোম্যাটো কর্মীদের মহাহড়তাল!

জ্বালানির আগুনে পুড়ছে পকেট, শনিবার দেশজুড়ে সুইগি-জোম্যাটো কর্মীদের মহাহড়তাল!

জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে এক অভিনব ও বড়সড় আন্দোলনের ডাক দিয়েছে দেশের গিগ ওয়ার্কার্সরা। আগামী ১৬ মে, শনিবার দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত টানা ৫ ঘণ্টা দেশজুড়ে কর্মবিরতি পালন করবেন ফুড ডেলিভারি ও ক্যাব চালকেরা। ‘গিগ অ্যান্ড প্ল্যাটফর্ম সার্ভিস ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’ (GIPSU)-এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সুইগি, জোম্যাটো, ব্লিনকিট, জেপ্টো, ওলা, উবার এবং র‍্যাপিডোর মতো শীর্ষস্থানীয় অ্যাপ-ভিত্তিক পরিষেবাগুলির লক্ষ লক্ষ কর্মী একযোগে অ্যাপ ‘লগ অফ’ করে এই ধর্মঘটে শামিল হতে চলেছেন। এর ফলে কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরুসহ দেশের বড় শহরগুলিতে শনিবার দুপুরের ব্যস্ত সময়ে পরিষেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ধর্মঘটের মূল কারণ ও শ্রমিকদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে তেল সংস্থাগুলি পেট্রোল ও ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ৩ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে গিগ ওয়ার্কার্সদের পকেটে, যাঁদের সিংহভাগই মূলত স্কুটার বা বাইকের ওপর নির্ভরশীল। ইউনিয়নের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, একজন ডেলিভারি পার্টনারকে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৭০ কিলোমিটার গাড়ি চালাতে হয়। তীব্র দাবদাহের মধ্যে দৈনিক ১২-১৪ ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনির পর জ্বালানি খরচ, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ও মোবাইল রিচার্জের পেছনেই আয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে। এর বিপরীতে অ্যাপ সংস্থাগুলি ডেলিভারি পিছু পারিশ্রমিক বাড়ায়নি, ফলে বহু কর্মী বর্তমানে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন। বর্তমানে দেশে প্রায় ১.২ কোটিরও বেশি গিগ কর্মী রয়েছেন, যাঁরা সামাজিক নিরাপত্তা, পেনশন বা ন্যূনতম মজুরির কোনো সুবিধা ছাড়াই সম্পূর্ণ প্ল্যাটফর্ম নির্ভর কাজ করছেন।

আন্দোলনের ৬ দফা দাবি

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইউনিয়ন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি সদর্থক পদক্ষেপ না করলে আগামীদিনে এই আন্দোলন আরও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেবে। গিগ কর্মীদের প্রধান দাবিগুলি হলো:

  • প্রতি কিলোমিটারের জন্য ন্যূনতম ২০ টাকা পরিষেবা হার নির্ধারণ করতে হবে।
  • জ্বালানির দাম বাড়ার সাথে সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর্মীদের পেমেন্ট বা পারিশ্রমিক সমন্বয় করতে হবে।
  • কাজের সময়সীমা নির্দিষ্ট করা এবং অতিরিক্ত সময়ের জন্য ওভারটাইম প্রদান।
  • স্বাস্থ্যবিমা, দুর্ঘটনা বিমা এবং পেনশন স্কিমের আওতায় আনা।
  • অ্যাপ সংস্থাগুলির একতরফা জরিমানা এবং আইডি নিষ্ক্রিয় (ডি-অ্যাক্টিভেশন) করার স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ করা।
  • সরকারের পক্ষ থেকে গিগ কর্মীদের জন্য পৃথক শ্রম আইন ও ন্যূনতম আয় নিশ্চিত করা।

সম্ভাব্য প্রভাব ও ভবিষ্যতের রূপরেখা

এই ধর্মঘটের ফলে শনিবার দুপুরের ‘পিক আওয়ার’-এ মধ্যাহ্নভোজের অনলাইন অর্ডার বা জরুরি গ্রোসারি ডেলিভারি পাওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে। পাশাপাশি ওলা-উবারের মতো ক্যাব পরিষেবা আংশিক ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘নমনীয় কাজের সুযোগ’ বা ‘ফ্লেক্সিবিলিটি’-র নামে এই বিশাল কর্মী বাহিনীকে পরোক্ষভাবে শোষণ করা হচ্ছে, যেখানে বহুজাতিক টেক সংস্থাগুলি বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করলেও প্রকৃত মাঠপর্যায়ের কর্মীরা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। ইউনিয়ন হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে, এটি কেবল ৫ ঘণ্টার প্রতীকী প্রতিবাদ; দাবি পূরণ না হলে ভবিষ্যতে পুরো পরিষেবা ব্যবস্থা স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটবেন তাঁরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *