আমেরিকা-চীন-ব্রিটেনে কেন ফাঁস হয় না প্রশ্ন? ভারতের ‘নীট’ বিপর্যয়ের মাঝে জানুন ওদের গোপন ফর্মুলা

ভারতে নিট-ইউজি (NEET-UG) ২০২৬ পরীক্ষার মতো বড় মাপের মেডিকেল প্রবেশিকা বাতিল হওয়ার ঘটনা শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকে আবারও প্রকাশ্যে এনেছে। ভারত যখন লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর জন্য কাগজের প্রশ্নপত্রে একই দিনে পরীক্ষা নেওয়ার ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি ধরে রেখেছে, তখন বিশ্বের উন্নত দেশগুলো প্রযুক্তি ও উন্নত ব্যবস্থাপনার জোরে প্রশ্নফাঁসের ঘটনাকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে। আমেরিকা, চীন এবং ব্রিটেনের মতো দেশগুলো এমন এক অভেদ্য পরীক্ষা পদ্ধতি গড়ে তুলেছে, যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা প্রায় আসাম্ভব।
কাগজের পরীক্ষা বনাম কম্পিউটারের আধুনিক প্রযুক্তি
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে সাধারণত এক দিনে, একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নপত্রে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়া হয়। এর জন্য প্রশ্নপত্র ছাপা, পরিবহন, বিভিন্ন কেন্দ্রে তা সংরক্ষণ এবং বিতরণ করার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রক্রিয়াগুলোর মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খলের (সাপ্লাই চেইন) যেকোনো স্তরেই তথ্য চুরি বা ফাঁসের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
বিপরীতে, আমেরিকা ও ব্রিটেনের মতো দেশগুলো কাগজের পরিবর্তে সম্পূর্ণ কম্পিউটার-ভিত্তিক পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। সেখানে বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনের পরিবর্তে বিভিন্ন তারিখে পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ থাকে এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা প্রোটোকল অত্যন্ত কঠোরভাবে বজায় রাখা হয়।
তিন দেশের অভেদ্য পরীক্ষা ব্যবস্থা
বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হলো চীনের ‘গাওকাও’ (Gaokao)। এই পরীক্ষাটি অত্যন্ত কঠোর নজরদারিতে অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি ক্যামেরা, পরীক্ষার্থীদের বায়োমেট্রিক যাচাইকরণ, মোবাইল সিগন্যাল জ্যামার এবং সম্পূর্ণ এনক্রিপ্টেড সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। এমনকি প্রশ্নপত্র যেখানে ছাপা হয়, সেই ছাপাখানাগুলোও থাকে সেনা ও গোয়েন্দা নজরদারিতে। ফলে এখানে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা বিরল।
অন্যদিকে, আমেরিকার মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষা বা ‘এমক্যাট’ (MCAT) বছরের বিভিন্ন সময়ে সুনির্দিষ্ট এবং স্থায়ী কিছু পরীক্ষা কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয়। এই পদ্ধতিতে একটি বিশাল প্রশ্নব্যাংক থেকে সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একেকজন পরীক্ষার্থীর জন্য একেক রকম প্রশ্ন সেট তৈরি করা হয়। ফলে কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো সুযোগ বা ঝুঁকি থাকে না।
যুক্তরাজ্যের ‘ইউসিএটি’ (UCAT) পরীক্ষাও একই মডেলে চলে। সেখানে শিক্ষার্থীরা কয়েক সপ্তাহ জুড়ে চলা অনলাইন পরীক্ষার মধ্য থেকে নিজেদের সুবিধাজনক সময় (টাইम স্লট) বেছে নিতে পারে। অনুমোদিত কেন্দ্রগুলোতে কঠোর নিরাপত্তা সফটওয়্যারের অধীনে এই পরীক্ষা সম্পন্ন হয়।
অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য প্রভাব
উন্নত দেশগুলোর এই সফল মডেলের পেছনে রয়েছে তাদের শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ২৫ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর জন্য পুরোপুরি অনলাইন পরীক্ষা আয়োজন করতে গেলে বিশাল কম্পিউটার অবকাঠামোর প্রয়োজন, যা বর্তমানে গ্রামীণ ও মফস্বল শহরগুলোতে অপর্যাপ্ত। ইন্টারনেট সংযোগের ধীরগতি, আকস্মিক বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাব এই আধুনিকীকরণের পথে বড় বাধা। তবে দীর্ঘমেয়াদে যদি এই প্রযুক্তিনির্ভর ও বহু-ধাপের পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা না যায়, তবে বারবার প্রশ্নফাঁসের কারণে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা এবং লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়তে বাধ্য।