“যেতে চাইলে যাক, একাই TMC-কে দাঁড় করাব!” কালীঘাটের বৈঠকে বিক্ষুব্ধদের চরম হুঁশিয়ারি মমতার

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে নজিরবিহীন বিপর্যয়ের পর এবার সংগঠনকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর প্রস্তুতি শুরু করলেন তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ধাক্কা খেয়ে রাজ্যের ক্ষমতা হারিয়ে এখন বিরোধী দলের আসনে বসেছে ঘাসফুল শিবির। এই টালমাটাল পরিস্থিতির মাঝেই কলকাতার কালীঘাটে নিজের বাসভবনে দলের পরাজিত ও জয়ী প্রার্থীদের নিয়ে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা বৈঠকে বসেন দলনেত্রী। বৈঠকে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও উপস্থিত ছিলেন। মূলত নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর নেতা-কর্মীদের ভাঙা মনোবল চাঙ্গা করা এবং সংগঠনে একতার বার্তা দেওয়াই ছিল এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য।
দলত্যাগীদের কড়া বার্তা ও নতুন করে শুরুর ডাক
বৈঠকে তৃণমূলের অন্দরে বাড়তে থাকা অসন্তোষ এবং দলবদলের জল্পনা নিয়ে অত্যন্ত কড়া অবস্থান নেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, “যাঁরা অন্য দলে যেতে চান, তাঁরা অনায়াসেই যেতে পারেন। আমি কাউকে জোর করে আটকে রাখায় বিশ্বাস করি না। আমি একাই দলকে আবার নতুন করে শূন্য থেকে খাড়া করব।” কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যে সমস্ত দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলিতে নতুন করে রং করে আবার খুলে দেওয়া হোক। প্রয়োজনে তিনি নিজে গিয়ে দলীয় কার্যালয়ে রং করবেন, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই আত্মসমর্পণ করবেন না। ক্ষমতা হারানোর পর বহু নেতা দলবদল করতে পারেন— এমন আশঙ্কা মেনে নিয়েও দলনেত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তৃণমূলের লড়াই থামবে না।
ভিত্তি নড়ে গেছে সংগঠনের, চুরির অভিযোগে সরব দলনেত্রী
সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভিত কার্যত কেঁপে উঠেছে। রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে শাসকদল থেকে সরাসরি প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হওয়া তৃণমূল মাত্র ৮০টি আসনে জয়লাভ করতে পেরেছে। দলের ২৯১ জন প্রার্থীর মধ্যে ২১১ জনই পরাজিত হয়েছেন, যার মধ্যে ছিলেন মমতা মন্ত্রিসভার একাধিক হেভিওয়েট মন্ত্রী ও প্রবীণ নেতা। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের গড় ভবানীপুর কেন্দ্রে তাঁর পরাজয়ের মাধ্যমে। তবে এই হারের পেছনে বিরোধী শিবিরের কারচুপিকে দায়ী করেছেন মমতা। বৈঠকে তিনি অভিযোগ করেন, জনগণের আসল রায়কে চুরি ও লুট করা হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় এজেন্সির ভয় দেখিয়ে ভোটার ও কর্মীদের প্রভাবিত করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ প্রভাব ও ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল পরাজয়ের পর তৃণমূলের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দলের অন্দরে বড়সড় ভাঙন রোধ করা এবং কর্মীদের আস্থা টিকিয়ে রাখা। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পর হঠাৎ বিরোধী আসনে বসায় দলের একাংশ নিষ্ক্রিয় বা দলত্যাগী হতে পারে, যা সংগঠনের জন্য বড় বিপদের কারণ হতে পারে। তবে কালীঘাটের বৈঠক থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মারমুখী ও আপসহীন মনোভাব বুঝিয়ে দিচ্ছে, তিনি সহজে জমি ছাড়ছেন না। আগামী দিনে বাংলায় এক শক্তিশালী ও আক্রমণাত্মক বিরোধী দল হিসেবে তৃণমূলকে তুলে ধরাই এখন তাঁর প্রধান লক্ষ্য, যার সূত্রপাত তিনি কালীঘাটের এই রুদ্ধদ্বার বৈঠক থেকেই করে দিলেন।