শিক্ষার আলোতেও কাটছে না অপরাধের অন্ধকার, দেশের জেলে ৭৭.৫ শতাংশ বন্দীই শিক্ষিত, শীর্ষে উত্তর প্রদেশ

সমাজে দীর্ঘকাল ধরে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, নিরক্ষরতা বা শিক্ষার আলো না পৌঁছানোই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রধান অনুঘটক। কিন্তু জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর (NCRB) সদ্য প্রকাশিত ‘প্রিজন স্ট্যাটিস্টিকস ইন্ডিয়া ২০২৪’ (PSI 2024) প্রতিবেদনটি সেই চিরাচরিত সামাজিক বিশ্বাসকে সম্পূর্ণ খণ্ডন করে দিয়েছে। বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে, দেশের সংশোধনাগারগুলিতে নিরক্ষরদের তুলনায় শিক্ষিত মানুষের ভিড়ই অনেক বেশি। ভারতের বিভিন্ন কারাগারে বন্দীদের এক বিশাল অংশই কোনো না কোনো স্তরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন, যা অপরাধ ও আধুনিক শিক্ষার পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে এক বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
কারাগারের শিক্ষা সংক্রান্ত খতিয়ান: ৭৭.৫% বন্দীই সাক্ষর
এনসিআরবি-র ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন সংশোধনাগারে থাকা মোট ৫,০৭,৫৭৮ জন বন্দীর মধ্যে মাত্র ১,১৪,২১৫ জন নিরক্ষর। অর্থাৎ, দেশের মোট জেলের বন্দীদের প্রায় ৭৭.৫ শতাংশই শিক্ষিত বা সাক্ষরতার আওতাভুক্ত।
পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেও অপরাধপ্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন কারাগারে:
- স্নাতক (Graduate) বন্দী: ৩৬,৫০৩ জন
- স্নাতকোত্তর (Post Graduate) বন্দী: ৯,৫১৬ জন
এই উচ্চশিক্ষিত বন্দীদের মধ্যে একাংশ ইতিমধ্যেই আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে সাজা খাটছেন, আবার এক বড় অংশ এখনও বিচারাধীন (Undertrial) বন্দী হিসেবে বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন।
শিক্ষাগত স্তরের নিখুঁত বিশ্লেষণ
কারাগারে বন্দীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিস্তারিত বিবরণ নিচের তালিকায় তুলে ধরা হলো:
| শিক্ষাগত স্তর | দোষী সাব্যস্ত বন্দী | বিচারাধীন বন্দী | মোট বন্দী |
| নিরক্ষর | ৩০,৩১১ | ৮৩,৯০৪ | ১,১৪,২১৫ |
| দশম শ্রেণীর নিচে | ৫৮,৫২৮ | ১,৪৮,৭০৫ | ২,০৭,২৩৩ |
| দশম শ্রেণীর উপরে, স্নাতকের নিচে | ৩৪,১৯৬ | ৯৯,৩৬৫ | ১,৩৩,৫৬১ |
| স্নাতক | ৮,৮৫৮ | ২৭,৬৪৫ | ৩৬,৫০৩ |
| কারিগরি ডিগ্রি/ডিপ্লোমা | ১,৮১২ | ৪,৭৩৮ | ৬,৫৫০ |
| স্নাতকোত্তর | ২,৪৩২ | ৭,০৮৪ | ৯,৫১৬ |
| সর্বমোট | ১,৩৬,১৩৮ | ৩,৭১,৪৪০ | ৫,০৭,৫৭৮ |
শিক্ষিত বন্দীদের সংখ্যায় শীর্ষে যে ৫টি রাজ্য
জেলে শিক্ষিত বন্দীদের (দোষী ও বিচারাধীন মিলিয়ে) সামগ্রিক উপস্থিতির নিরিখে দেশের মধ্যে সবার ওপরে রয়েছে উত্তর প্রদেশ। শীর্ষ পাঁচটি রাজ্যের তালিকা নিম্নরূপ:
১. উত্তর প্রদেশ: মোট শিক্ষিত বন্দী ৬০,৩৫৪ জন (সাজাপ্রাপ্ত ১৯,৫৮৫; বিচারাধীন ৪০,৭৬৯)
২. বিহার: মোট শিক্ষিত বন্দী ৪০,৪৭৬ জন (সাজাপ্রাপ্ত ৫,৩৯৩; বিচারাধীন ৩৫,০৮৩)
৩. মধ্যপ্রদেশ: মোট শিক্ষিত বন্দী ৩৫,৭২২ জন (সাজাপ্রাপ্ত ১৭,১৯৬; বিচারাধীন ১৮,৫২৬)
৪. মহারাষ্ট্র: মোট শিক্ষিত বন্দী ৩১,৭৬৪ জন (সাজাপ্রাপ্ত ৫,৬৩৩; বিচারাধীন ২৬,১৩১)
৫. পাঞ্জাব: মোট শিক্ষিত বন্দী ২২,১৬৯ জন (সাজাপ্রাপ্ত ৪,৮৯৩; বিচারাধীন ১৭,২৭৬)
উচ্চশিক্ষিত ও কারিগরি ডিগ্রিধারীদের রিপোর্ট কার্ড
- স্নাতক স্তরের অপরাধী: স্নাতক বা গ্র্যাজুয়েট বন্দীদের সংখ্যার দিক থেকেও উত্তর প্রদেশ দেশে প্রথম স্থানে রয়েছে (৭,৪৪৯ জন)। এরপর রয়েছে যথাক্রমে মহারাষ্ট্র (৩,৩৮১ জন), বিহার (৩,১৫১ জন), রাজস্থান (২,৬৭০ জন) এবং হরিয়ানা (২,০৪৯ জন)।
- স্নাতকোত্তর স্তরের অপরাধী: স্নাতকোত্তর (Post Graduate) ডিগ্রিধারী বন্দীদের তালিকায় শীর্ষে থাকা উত্তর প্রদেশে এই সংখ্যা ২,১২২ জন। পরবর্তী স্থানগুলিতে রয়েছে রাজস্থান (১,১৮৫ জন), মহারাষ্ট্র (১,১৫২ জন), পাঞ্জাব (৬২৮ জন) এবং বিহার (৫২৬ জন)।
- টেকনিক্যাল ও পেশাদার ডিগ্রীধারী: প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি বা টেকনিক্যাল শিক্ষা (ইঞ্জিনিয়ারিং, ডিপ্লোমা ইত্যাদি) সম্পন্ন করা বন্দীদের সংখ্যাও যথেষ্ট নজরকাড়া। সারা দেশের জেলে মোট ৬,৫৫০ জন কারিগরি ডিগ্রিধারী রয়েছেন, যার মধ্যে ১,৮১২ জন সাজাপ্রাপ্ত এবং ৪,৭৩৮ জন বিচারাধীন। এই তালিকাতেও ১,১৪৮ জন বন্দী নিয়ে শীর্ষে উত্তর প্রদেশ। এরপর রয়েছে পাঞ্জাব (৬৯১ জন), তামিলনাড়ু (৬৭৮ জন), মহারাষ্ট্র (৪৬৫ জন) এবং কর্ণাটক (৪৩৯ জন)।
অপরাধবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, প্রযুক্তির অপব্যবহার, সাইবার ক্রাইম, আর্থিক জালিয়াতি বা হোয়াইট কলার ক্রাইমের (White Collar Crime) মতো আধুনিক অপরাধগুলির বৃদ্ধির কারণেই কারাগারে শিক্ষিত ও পেশাদার ডিগ্রিধারীদের সংখ্যা এভাবে বাড়ছে। প্রথাগত শিক্ষা মানুষকে উপার্জনের পথ দেখালেও নৈতিক শিক্ষার অভাব ও রাতারাতি বড়লোক হওয়ার মানসিকতাই শিক্ষিত যুবসমাজকে অপরাধের অন্ধকার গলিতে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।