খরচ কমাতে নবান্নের কড়া দাওয়াই, এবার সাশ্রয় নীতিতে সরকারি দফতরেও কি ওয়ার্ক ফ্রম হোম!

খরচ কমাতে নবান্নের কড়া দাওয়াই, এবার সাশ্রয় নীতিতে সরকারি দফতরেও কি ওয়ার্ক ফ্রম হোম!

রাজ্যের প্রশাসনিক কাজে গতি আনা এবং রাজকোষের অপ্রয়োজনীয় খরচ কমাতে একগুচ্ছ কড়া পদক্ষেপ নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। জ্বালানি সাশ্রয়, পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ব্যবহার এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সর্বাধিক প্রসারে জোর দিয়ে সোমবার মুখ্যসচিবের দফতর থেকে একটি জরুরি নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। মূলত মুখ্যমন্ত্রীর পূর্ববর্তী নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করেই ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য প্রতিটি সরকারি দফতর ও জেলা প্রশাসনকে একটি নির্দিষ্ট ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ বা কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশিকার জেরে সরকারি স্তরে ব্যাপক রদবদল ঘটতে চলেছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

নবান্নের সাত দফা সাশ্রয় নীতি ও আধুনিকীকরণ

মুখ্যসচিবের নির্দেশ অনুযায়ী, মূলত সাতটি মূল বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এই নতুন কর্মপরিকল্পনা সাজাতে হবে। প্রথমত, সরকারি কাজের পর্যালোচনা বা সাধারণ বৈঠকের ক্ষেত্রে সশরীরে উপস্থিতির বদলে ভিডিও কনফারেন্স বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে হবে। এমনকি যেখানে সম্ভব, কাজের মান বজায় রেখে কর্মীদের ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাড়ি থেকে কাজের বিষয়টিও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে বড় আধিকারিকদের ক্ষেত্রে কার-পুলিং, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট (বাস-মেট্রো) এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া, বিদ্যুৎ অপচয় রুখতে এনার্জি-সেভিং যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং ‘ই-অফিস’ ব্যবস্থার মাধ্যমে কাগজহীন অফিস (Paperless Office) গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি কেনাকাটার ক্ষেত্রে দেশীয় ও রাজ্যে তৈরি স্থানীয় পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি বর্জ্য নিষ্কাশন ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় বন্ধের কথা বলা হয়েছে। একই সাথে সুস্থ জীবনযাত্রার বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতে স্থানীয় ভাবে উৎপাদিত ভোজ্য তেল এবং অর্গানিক পণ্যের ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে নবান্ন।

কড়া সময়সীমা ও প্রশাসনিক প্রভাব

এই নির্দেশিকা বাস্তবায়নে নবান্ন যে অত্যন্ত কঠোর, তা স্পষ্ট হয়েছে মুখ্যসচিবের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা থেকে। প্রতিটি দফতরকে তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে আগামী ২২ মে, ২০২৬ তারিখের মধ্যে এই অ্যাকশন প্ল্যান মুখ্যসচিবের দফতরে জমা দিতে হবে। এরপর আগামী ১ জুলাই থেকে প্রতি মাসে এই কাজের অগ্রগতির খতিয়ান নিয়ে ‘মান্থলি রিপোর্ট’ পাঠানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। রাজ্যের সমস্ত অ্যাডিশনাল চিফ সেক্রেটারি, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি এবং জেলাশাসকদের এই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে অধীনস্থ অফিসগুলিতে তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনিক মহলের মতে, বিশ্বজুড়ে জ্বালানির সংকট এবং অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের আবহে এই ধরনের সাশ্রয় নীতি অত্যন্ত সময়োপযোগী। একদিকে যেমন ভার্চুয়াল মিটিং ও ডিজিটাল ফাইলের ব্যবহারে সরকারি কাজে গতি আসবে এবং কাগজের খরচ বাঁচবে, অন্যদিকে বাস-মেট্রো বা কার-পুলিংয়ের ফলে সরকারি গাড়ি ও জ্বালানি বাবদ রাজকোষের একটি বড় অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় হবে। সামগ্রিকভাবে, সরকারি ভাঁড়ারের চাপ কমাতে এবং প্রশাসনকে আরও পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক করে তুলতেই নবান্নের এই সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *