সকালভর ‘ম্যারাথন’ জেরা, শেষমেশ ইডির জালে ধরা পড়ল সোনা পাপ্পু

সকালভর ‘ম্যারাথন’ জেরা, শেষমেশ ইডির জালে ধরা পড়ল সোনা পাপ্পু

দিনের পর দিন পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে নেটপাড়ায় সক্রিয় থাকা, আর অবশেষে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার জালে ধরা পড়া— টলিউড থ্রিলারকেও হার মানাবে দক্ষিণ কলকাতার কুখ্যাত সিন্ডিকেট ডন বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে ‘সোনা পাপ্পু’-র গ্রেফতারির ঘটনাক্রম। সোমবার সকাল থেকে সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের পর গভীর রাতে ইডির (এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট) হাতে গ্রেফতার হলেন বালিগঞ্জ ও কসবা অঞ্চলের এই ত্রাস। জমি প্রতারণা, সিন্ডিকেট-তোলাবাজি এবং বিপুল অঙ্কের বেআইনি আর্থিক লেনদেনের মামলায় অবশেষে শ্রীঘরে ঠাঁই হলো তাঁর।

দিনভর ম্যারাথন জেরা ও বয়ানে অসঙ্গতি

সোমবার সকালে আচমকাই ইডি দফতরে হাজিরা দেন সাড়ে তিন মাস ধরে ‘ফেরার’ থাকা সোনা পাপ্পু। দফতরে ঢোকার মুখে নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও ভেতরে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের জেরার মুখে কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েন তিনি। তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে খবর, দিনভর জিজ্ঞাসাবাদে চরম অসহযোগিতা করেন পাপ্পু। তাঁর বিপুল সম্পত্তি, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন এবং জমি সংক্রান্ত বিষয়ে একের পর এক প্রশ্ন করা হলেও তিনি অধিকাংশ উত্তর এড়িয়ে যান। এই মামলার অন্য দুই ধৃত— ব্যবসায়ী জয় কামদার ও প্রভাবশালী পুলিশকর্তা শান্তনু সিংহ বিশ্বাসের সঙ্গে নিজের ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত যোগাযোগও সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন তিনি। নথিপত্র সামনে রেখে ধৃতদের মুখোমুখি বসানো হলেও বয়ানে মিলছিল না কোনো সদুত্তর। তদন্তে ইচ্ছাকৃত বাধা দেওয়া এবং বয়ানে চরম অসঙ্গতি থাকার কারণেই গভীর রাতে তাঁকে গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নেন ইডি আধিকারিকরা।

পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে ফেসবুক লাইভের ‘ম্যাজিক’

গত ফেব্রুয়ারি মাসে রবীন্দ্র সরোবর এলাকায় একটি বড়সড় গন্ডগোলের ঘটনায় নাম জড়ানোর পর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন সোনা পাপ্পু। পুলিশের খাতায় দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস ধরে তিনি পলাতক থাকলেও, সমাজমাধ্যমে রীতিমতো সক্রিয় ছিলেন। প্রায়শই তাঁকে নিজের হ্যান্ডেল থেকে ‘ফেসবুক লাইভ’ করতে দেখা যেত। পুলিশ যখন খাতায়-কলমে তাঁর হদিশ পাচ্ছিল না, তখন প্রকাশ্যেই নেটপাড়ায় ঘুরে বেড়িয়েছেন এই ডন। সোমবার তাঁর এই আকস্মিক আত্মসমর্পণ ও পরবর্তীতে গ্রেফতারি রাজ্য রাজনীতিতে ব্যাপক শোরগোল ফেলে দিয়েছে।

সিন্ডিকেট রাজ, উদ্ধার হওয়া কোটি কোটি টাকা ও হাওয়ালা যোগ

দক্ষিণ কলকাতার কসবা, বালিগঞ্জ ও গড়িয়াহাট চত্বরে প্রোমোটিং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, বেআইনি জমি দখল, হুমকি, তোলাবাজি ও অস্ত্র আইনের একাধিক মামলা রয়েছে সোনা পাপ্পুর বিরুদ্ধে। গত এপ্রিল মাসে তাঁর ডেরায় তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ২ কোটি নগদ টাকা, একটি বিলাসবহুল গাড়ি এবং কোটি কোটি টাকার সন্দেহভাজন সম্পত্তির দলিল উদ্ধার করে ইডি। তদন্তকারীদের অনুমান, সাড়ে তিন মাস পলাতক থাকা অবস্থাতেও পাপ্পুর বিলাসবহুল জীবনযাপন ও অর্থের জোগান সচল রাখতে ‘হাওয়ালা’ চক্র ব্যবহার করা হয়েছিল। কলকাতা থেকেই হাওয়ালা মারফত নিয়মিত মোটা অঙ্কের টাকা তাঁর কাছে পাঠানো হতো বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা।

প্রভাবশালী যোগ ও তদন্তের সম্ভাব্য প্রভাব

এই মামলার জাল যে অত্যন্ত গভীরে, তা স্পষ্ট হয় যখন ইডি প্রথমে ব্যবসায়ী জয় কামদার এবং পরবর্তীতে ফার্ন রোডের প্রভাবশালী পুলিশকর্তা শান্তনু সিংহ বিশ্বাসকে গ্রেফতার করে। একজন পুলিশ আধিকারিকের এই অপরাধ চক্রে সরাসরি যুক্ত থাকা এবং আর্থিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়টি খোদ প্রশাসনের অন্দরমহলকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সোনা পাপ্পুর গ্রেফতারির পর এবার এই তিনজনকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইডি। তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য, এই সিন্ডিকেট সাম্রাজ্যের তোলাবাজির টাকা আর কোন কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক নেতার পকেটে পৌঁছেছে, তা উপড়ে বের করা। আজ, মঙ্গলবার সোনা পাপ্পুকে বিশেষ ইডি আদালতে পেশ করে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাবে কেন্দ্রীয় সংস্থা, যেখান থেকে আরও বহু বিস্ফোরক তথ্য সামনে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *