আরব মিত্রদের অনুরোধে আপাতত যুদ্ধ স্থগিত, ইরানের ওপর হামলার সিদ্ধান্ত বদলালেন ট্রাম্প

আরব মিত্রদের অনুরোধে আপাতত যুদ্ধ স্থগিত, ইরানের ওপর হামলার সিদ্ধান্ত বদলালেন ট্রাম্প

পশ্চিম এশিয়ায় চরম উত্তেজনার পারদ চড়িয়েও শেষ মুহূর্তে পিছু হটলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার থেকেই ইরানের ওপর যে বহু আলোচিত ও জোরদার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার কথা ছিল, তা আপাতত স্থগিত রাখার ঘোষণা করেছেন তিনি। সোমবার গভীর রাতে নিজের ব্যক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি পোস্টের মাধ্যমে ট্রাম্প তাঁর এই নাটকীয় সিদ্ধান্তের কথা জানান। কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আরবের শক্তিশালী মিত্র দেশগুলির বিশেষ অনুরোধ ও কূটনৈতিক তৎপরতার কারণেই এই যুদ্ধযাত্রা থামানো হয়েছে বলে ওয়াশিংটন সূত্রে খবর।

আরব দুনিয়ার মধ্যস্থতা ও ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি

ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর পোস্টে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, কাতারের আমির তামিম বিন হামাদ আল থানি, সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আল সৌদ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রপতি মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের অনুরোধে এই হামলা স্থগিত করা হয়েছে। এই মুহূর্তে ইরানকে নিয়ে পর্দার আড়ালে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে এবং আরবের এই দেশগুলি আশা করছে এমন একটি চুক্তি সম্পাদিত হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।

তবে এই যুদ্ধ স্থগিতের সমান্তরালে ট্রাম্প তাঁর চিরপরিচিত আগ্রাসী অবস্থানও বজায় রেখেছেন। তিনি মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যানিয়েল কেইনকে মঙ্গলবার হামলা না চালানোর নির্দেশ দিলেও, বাহিনীকে হাই অ্যালার্টে রেখেছেন। ট্রাম্পের সাফ কথা, প্রস্তাবিত চুক্তির প্রধান শর্ত হতে হবে যে ইরানের হাতে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না। যদি কোনো গ্রহণযোগ্য চুক্তি না হয়, তবে যেকোনো মুহূর্তে নির্দেশ পাওয়া মাত্রই ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ও ব্যাপক মাত্রার আক্রমণ শুরু করার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীকে প্রস্তুত থাকার কড়া বার্তা দিয়েছেন তিনি।

অভিযান স্থগিতের কারণ ও কূটনৈতিক চাপ

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর এই নিয়ে একাধিকবার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েও শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে এলেন। কূটনৈতিক ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ও সামরিক থিঙ্কট্যাঙ্কগুলি ট্রাম্পকে কোনো দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে না জড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। ফলে ট্রাম্পের আসল কৌশল হলো—সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে চরম মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও সামরিক ভয় দেখিয়ে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে পুরোপুরি সংকুচিত করা।

পাশাপাশি, ইরানও পাল্টা আঘাতের যে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে, তাতে শুধু আমেরিকা নয়, গোটা আরব দুনিয়া এবং মার্কিন মিত্র দেশগুলি চরম শঙ্কায় রয়েছে। যুদ্ধ শুরু হলে তার আঁচ এসে পড়বে আরব অর্থনীতির ওপর, এই আশঙ্কা থেকেই পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি ট্রাম্পকে সংযত হওয়ার জন্য প্রবল কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।

পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো শান্তি প্রস্তাব ও ক্ষোভ

এই চরম উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছিল সম্প্রতি পাকিস্তানের হাত দিয়ে পাঠানো তেহরানের একটি অদ্ভুত শান্তি প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে। ওই প্রস্তাবে ইরানের তরফে দাবি করা হয় যে, ২৮ মে থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে ইরানের যাবতীয় ক্ষয়ক্ষতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মিটিয়ে দিতে হবে এবং ইরানকে একটি ইসলামিক রিপাবলিক হিসেবে আমেরিকাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয়, এই শান্তি প্রস্তাবে ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরি বন্ধের বিষয়ে কোনো উল্লেখ ছিল না।

এই প্রস্তাব পাওয়ার পরেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, যুদ্ধবিরতি এখন ‘লাইভ সাপোর্টে’ রয়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর জন্য অনন্তকাল অপেক্ষা করবে না। আমেরিকার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতে, ইরান যদি তাদের পারমাণবিক অবস্থান পরিবর্তন না করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র বোমার মাধ্যমেই তাদের সঙ্গে আলোচনা চালাবে, যা হবে অত্যন্ত মারাত্মক। আপাতত আরবের মিত্রদের সদিচ্ছাকে মর্যাদা দিয়ে ট্রাম্প যুদ্ধ থামালেও, পশ্চিম এশিয়ার আকাশে যুদ্ধের মেঘ কিন্তু পুরোপুরি কেটে যায়নি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *