কন্ট্রোলরুমে বসেই কোটি টাকার প্রাসাদ, পর্দাফাঁস কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন ডিসির কীর্তি

রাজ্যে সরকার বদলের পরপরই এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) জালে ধরা পড়েছেন কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন ডিসি তথা কালীঘাটের প্রাক্তন ওসি শান্তনু সিনহা বিশ্বাস। তাঁর গ্রেফতারির পর থেকেই একে একে সামনে আসছে বিপুল দুর্নীতির খতিয়ান। কান্দির জেমু এলাকায় তাঁর পৈতৃক ভিটে যেভাবে গত দুই বছরে এক বিপুল প্রাসাদে রূপান্তরিত হয়েছে, তা দেখে চোখ কপালে উঠেছে সাধারণ মানুষের। একজন পুলিশ আধিকারিকের সীমিত বেতনে কীভাবে এমন বিলাসবহুল ‘সাত মহলা’ বাড়ি তৈরি সম্ভব, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে শোরগোল পড়ে গিয়েছে।
সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জমি দখল ও মিথ্যা মামলা
তদন্তকারী সংস্থা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই বিপুল সম্পত্তির নেক্সাস চলত অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে। শহরের বুকে অসহায় বয়স্ক নাগরিক কিংবা পুরনো বাড়ির মালিকদের প্রথমে চিহ্নিত করত একটি বিশেষ সিন্ডিকেট। এরপর কম দামে সেই সম্পত্তি বিক্রি করার জন্য মালিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতো। কেউ রাজি না হলে শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের নির্দেশে স্থানীয় থানায় তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে হুমকি দেওয়া হতো। ব্যবসায়ী জয় কামদার ও সোনা পাপ্পুর মতো ব্যক্তিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই অবৈধ জমি দখল ও তোলাবাজির কারবার চালানো হতো বলে অভিযোগ। এমনকি পুলিশের বদলি সংক্রান্ত বিষয়ও তিনি নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট থেকে তথ্য মিলেছে।
প্রাসাদোপম বাড়ির অন্দরমহল
কান্দির জেমু এলাকায় অবস্থিত এই বাড়িটি গত দুই বছর ধরে চোখের সামনে তৈরি হতে দেখেছেন প্রতিবেশীরা। ধবধবে সাদা রঙের এই বাড়ির সামনে বসানো হয়েছে বিশালাকার সিংহমূর্তি, প্রবেশদ্বারে রয়েছে পেল্লায় দরজা। বিশাল প্রাচীর ঘেরা এই দুর্গের মতো প্রাসাদে মাঝেমধ্যে শান্তনু এসে থাকলেও, মূলত তাঁর বোন তথা কান্দি পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান গৌরী সিনহা বিশ্বাস সেখানে থাকেন। একসময়ের সাধারণ পৈতৃক বাড়িটি রাতারাতি কীভাবে মহলের রূপ নিল, তা এখন তদন্তের মূল বিষয়। বর্তমানে শান্তনুর গ্রেফতারির পর বাড়িটিতে বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আয়ের সাথে সম্পত্তির অসঙ্গতি
তদন্তকারীদের মূল নজর এখন এই বিপুল অর্থের উৎসের দিকে। একজন ওসির আনুমানিক বেতন যেখানে ৭০ হাজার টাকা এবং ডিসি পদের বেতন ১ লক্ষ টাকার কিছু বেশি, সেখানে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে এই ধরনের রাজকীয় ভবন নির্মাণ কোনোভাবেই সংগতিপূর্ণ নয়। রাজনৈতিক প্রভাব খটিয়ে এবং পদের অপব্যবহার করে এই বিপুল কালো টাকা সাম্রাজ্য গড়ে তোলা হয়েছিল বলে প্রাথমিক অনুমান। এই ঘটনার ফলে রাজ্য পুলিশ প্রশাসনের অন্দরে থাকা দুর্নীতির শিকড় কতটা গভীরে, তা আরও একবার প্রকাশ্যে চলে এল, যা আগামী দিনে প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে বড়সড় প্রভাব ফেলতে চলেছে।