পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির তিন ‘পদ্মাবতী’, এক দশকের অবিশ্বাস্য যাত্রায় কার পাল্লা ভারী, প্রথম স্থানে কি অগ্নিমিত্রা?

পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির তিন ‘পদ্মাবতী’, এক দশকের অবিশ্বাস্য যাত্রায় কার পাল্লা ভারী, প্রথম স্থানে কি অগ্নিমিত্রা?

বিগত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক অবিশ্বাস্য উত্থান প্রত্যক্ষ করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মাত্র ৩টি আসন থেকে শুরু করে ২০২৬ সালে ২০৭টি আসন নিয়ে রাজ্যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠন করেছে পদ্মশিবির। দলের এই দীর্ঘ ও চড়াই-উতরাইপূর্ণ যাত্রাপথে ভিন্ন জগৎ থেকে এসে রাজনীতির মূল স্রোতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন তিন নারী— রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, লকেট চট্টোপাধ্যায় এবং অগ্নিমিত্রা পাল। রাজ্য রাজনীতির অলিন্দে যাঁরা পরিচিত ‘তিন পদ্মাবতী’ নামে। এক দশকের এই যাত্রা শেষে এখন রাজনৈতিক মহলে বড় প্রশ্ন, এই তিন নেত্রীর মধ্যে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ওজনে ঠিক কে এগিয়ে? সমীকরণ বলছে, আপাতত বাকি দু’জনকে পিছনে ফেলে প্রথম স্থানে উঠে এসেছেন অগ্নিমিত্রা পাল।

উত্থান ও সমীকরণের খেলা

অভিনয় ও ফ্যাশন জগতের পরিচিত মুখ থেকে রাজনীতির ময়দানে আসা এই তিন নেত্রীই বিভিন্ন সময়ে বিজেপির মহিলা মোর্চার রাজ্য সভানেত্রীর দায়িত্ব সামলেছেন। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এবং রাজ্যে বিজেপির সরকার গঠনের পর সমীকরণ অনেকটাই বদলে গিয়েছে। লকেট চট্টোপাধ্যায় সংগঠনে অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং টানা তিন বার রাজ্য সাধারণ সম্পাদকের পদ ধরে রেখে বেনজির রেকর্ড গড়েছেন। উত্তরাখণ্ডের বিধানসভা নির্বাচনে সহকারী পর্যবেক্ষক হিসেবে দলকে জেতাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন তিনি। অন্য দিকে, রূপা গঙ্গোপাধ্যায় মাঝে কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লেও ২০২৬-এর নির্বাচনে সোনারপুর দক্ষিণ থেকে জিতে ফের আলোচনায় এসেছেন।

কিন্তু সমস্ত চর্চাকে ছাপিয়ে গিয়েছেন অগ্নিমিত্রা পাল। আসানসোল দক্ষিণ আসন থেকে দ্বিতীয় বার বিপুল ব্যবধানে জয়ী হওয়ার পর নবগঠিত রাজ্য সরকারে একেবারে প্রথম সারির মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী ও দিলীপ ঘোষের পরেই তৃতীয় স্থানে শপথ নেন অগ্নিমিত্রা। তাঁর হাতে এসেছে পুর ও নগরোন্নয়ন, নারী ও শিশুকল্যাণ এবং সমাজকল্যাণের মতো অত্যন্ত ওজনদার দফতর। ফলে পদের ‘ভার’ ও ‘ধার’— দুই বিচারেই তিনি এখন বাকিদের চেয়ে এগিয়ে।

এগিয়ে যাওয়ার মূল কারণ

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলীয় সূত্রের মতে, অগ্নিমিত্রার এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে তাঁর ‘উপযুক্ত সময়ে নির্বাচনী সাফল্য’ এবং চরম সাংগঠনিক অধ্যবসায়। ২০২২ সালের আসানসোল উপনির্বাচন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মেদিনীপুর থেকে পরাজিত হলেও, তিনি নিজের বিধায়ক পদটি ধরে রাখতে পেরেছিলেন। ফলে বিধানসভায় দলের প্রথম সারির মহিলা মুখ হিসেবে তিনি সর্বদা সোচ্চার ছিলেন এবং ২০২৬ সালে পুনরায় নিজের কেন্দ্রে জয়লাভ করেন।

এর বিপরীতে লকেট চট্টোপাধ্যায়ের হার-জিতের সময়কালটি অনুকূল ছিল না। ২০২১ সালে চুঁচুড়া এবং ২০২৪ সালে হুগলি লোকসভা কেন্দ্রে পরাজিত হওয়ায় একপ্রকার জনপ্রতিনিধিত্বহীন হয়ে পড়েন তিনি, যা তাঁর রাজনৈতিক ওজনকে কিছুটা কমিয়েছে। আর রূপা গঙ্গোপাধ্যায় ২০২১ সালের পর থেকে দলীয় কর্মসূচিতে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন, যার খেসারত তাঁকে দিতে হয়েছে।

পাশাপাশি অগ্নিমিত্রার ‘বাধ্য ছাত্রী’র মতো মনোভাব তাঁর এই উত্তরণে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। দল যখনই তাঁকে কোনো আন্দোলনে নামার, থানায় ধর্না দেওয়ার বা পথ অবরোধের নির্দেশ দিয়েছে, তিনি ফলাফলের তোয়াক্কা না করে তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। লকেটের ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে মান-অভিমান বা দলবদলের জল্পনা তৈরি হলেও, অগ্নিমিত্রা নিজেকে সম্পূর্ণ নিবেদিত রেখেছেন।

ভবিষ্যতের সম্ভাব্য প্রভাব

প্রথম বার সরকার গঠনে অগ্নিমিত্রা পালের এই উল্কাসম উত্থান রাজ্য বিজেপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে এই শীর্ষস্থান ধরে রাখা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পুর ও নগরোন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ দফতর সামলাতে গিয়ে প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় দেওয়া এখন তাঁর প্রধান কাজ। অন্য দিকে, সংগঠনে লকেট চট্টোপাধ্যায়ের প্রভাব এবং বিধানসভায় প্রথম বার নির্বাচিত রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের নতুন উদ্যম আগামী দিনে এই তিন ‘পদ্মাবতী’র পারস্পরিক প্রতিযোগিতার সমীকরণকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *