ফোর্ট উইলিয়ামে সিবিআইয়ের নজিরবিহীন হানা, ৫০ লাখের ঘুষকাণ্ডে ধৃত সেনার কর্নেল!

ফোর্ট উইলিয়ামে সিবিআইয়ের নজিরবিহীন হানা, ৫০ লাখের ঘুষকাণ্ডে ধৃত সেনার কর্নেল!

কলকাতার ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের সদর দফতর ফোর্ট উইলিয়ামে সিবিআইয়ের এক নজিরবিহীন অভিযানে গ্রেফতার হয়েছেন এক উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা। ধৃত অফিসারের নাম হিমাংশু বালি, যিনি ইস্টার্ন কমান্ডের ‘আর্মি অর্ডন্যান্স কোর’ (AOC)-এ কর্নেল পদমর্যাদায় কর্মরত ছিলেন। সেনা টেন্ডার পাইয়ে দেওয়া এবং বিল পাশ করানোর নামে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে তাঁকে হাতেনাতে পাকড়াও করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। ফোর্ট উইলিয়ামের মতো অত্যন্ত সুরক্ষিত ও সংবেদনশীল সেনা ঘাঁটির অন্দরে এই হাই-প্রোফাইল অফিসারের গ্রেফতারির ঘটনায় প্রতিরক্ষা মহল ও তিলোত্তমায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।

যেভাবে চলত ঘুষের কারবার

সিবিআই সূত্রে জানা গেছে, কানপুরের একটি বেসরকারি ডিফেন্স সাপ্লাইয়ার সংস্থা ‘মেসার্স ইস্টার্ন গ্লোবাল লিমিটেড’-কে অন্যায্যভাবে কোটি কোটি টাকার সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার মূল কারিগর ছিলেন কর্নেল হিমাংশু বালি। মোটা অঙ্কের দুর্নীতির বিনিময়ে তিনি ওই সংস্থাকে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন টেন্ডার পাইয়ে দেওয়া, নিম্নমানের সামগ্রীর নমুনাকে ছাড়পত্র দেওয়া এবং বাড়িয়ে দেখানো ভুয়ো বিল অনায়াসে ক্লিয়ার করে দিতেন। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার এফআইআর অনুযায়ী, গত মার্চ ও এপ্রিল মাস জুড়ে ওই সংস্থার মালিক অক্ষত আগরওয়াল ও তাঁর বাবা মায়াঙ্ক আগরওয়ালের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন কর্নেল বালি। এমনকী গত ২২ এপ্রিল কলকাতার পার্ক স্ট্রিট এলাকায় ডিউটি আওয়ার্সের বাইরে ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে একটি গোপন বৈঠকও করেন তিনি, যার ঠিক দু’দিন পরেই ওই সংস্থাকে একটি বড় টেন্ডার পাইয়ে দেওয়া হয়।

হাওলা যোগ এবং সিবিআইয়ের ফাঁদ

গোয়েন্দাদের দাবি, চুক্তি অনুযায়ী গত ১৬ মে ৫০ লক্ষ টাকা ঘুষ দাবি করেন ওই সেনা কর্মকর্তা। এই বিপুল পরিমাণ টাকা কলকাতা থেকে দিল্লি-এনসিআর এলাকায় এক এজেন্টের মাধ্যমে ‘হাওলা’ রুটে পাচারের ছক কষা হয়েছিল। সোমবার দিল্লির চাঁদনি চক এলাকা থেকে হাওলা মারফত এই টাকা তোলার তোড়জোড়ের গোপন খবর পায় সিবিআই। এর পরেই দুর্নীতি দমন আইনে মামলা রুজু করে ফাঁদ পাতেন গোয়েন্দারা এবং কলকাতা থেকে হিমাংশু বালিকে গ্রেফতার করা হয়। এই মামলায় কানপুরের ওই ব্যবসায়ী বাবা-ছেলে এবং আশুতোষ শুক্লা নামে তাঁদের এক সহযোগীর বিরুদ্ধেও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র ও দুর্নীতির মামলা দায়ের করা হয়েছে। ধৃত কর্নেলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ট্রানজিট রিম্যান্ডে দিল্লি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

ঘটনার প্রভাব ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

জাতীয় নিরাপত্তার সাথে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ সেনা ঘাঁটির অন্দরে বসে কীভাবে এমন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও হাওলা চক্র চালানো হচ্ছিল, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেছে। এই ঘটনার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ টেন্ডার ও বিল পাশ করানোর প্রক্রিয়ায়, যা আগামীদিনে আরও কঠোর নজরদারির আওতায় আসতে চলেছে। নিম্নমানের সামগ্রী সেনা বিভাগে সরবরাহ করার এই প্রবণতা জওয়ানদের সুরক্ষা ও সামরিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারত বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সিবিআই এখন এই চক্রের শিকড় কতদূর বিস্তৃত এবং ফোর্ট উইলিয়ামের আর কোনও কর্মকর্তা এতে জড়িত আছেন কি না, তা খতিয়ে দেখতে মরিয়া।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *