লাহোরে ফিরছে ইতিহাস, ইসলামীয় নাম বদলে হিন্দু ও শিখ ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে পাকিস্তান

লাহোরে ফিরছে ইতিহাস, ইসলামীয় নাম বদলে হিন্দু ও শিখ ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে পাকিস্তান

দেশভাগের প্রায় আট দশক পর এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিল পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশ সরকার। সে দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন শহর লাহোরের বিভিন্ন রাস্তা, গলি, চক এবং উদ্যানের বর্তমান ইসলামীয় নাম পরিবর্তন করে দেশভাগ-পূর্ববর্তী হিন্দু, শিখ, জৈন ও ঔপনিবেশিক আমলের নাম ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজের সভাপতিত্বে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই ঐতিহাসিক পরিকল্পনা অনুমোদন পায়। ইতিমিধ্যেই লাহোরের বিভিন্ন অংশে পুরনো নাম সম্বলিত নতুন সাইনবোর্ডও দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।

ইতিহাসের পুনর্জন্ম ও নামের রূপান্তর

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, লাহোরের অন্তত নয়টি প্রধান স্থান আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের আদি ও ঐতিহাসিক পরিচয় ফিরে পেয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘ইসলামপুরা’ এলাকার নাম পরিবর্তন করে পুনরায় ‘কৃষাণ নগর’ করা হয়েছে। একইভাবে ‘মুস্তাফাবাদ’ ফিরে পেয়েছে তার পুরনো নাম ‘ধরমপুরা’। ‘সুন্নত নগর’ রূপান্তরিত হয়েছে ‘সন্ত নগর’-এ এবং ‘বাবরি মসজিদ চক’-এর নাম বদলে পুনরায় রাখা হয়েছে ‘জৈন মন্দির চক’।

শুধু ধর্মীয় স্থানই নয়, ঔপনিবেশিক আমলের ঐতিহাসিক নামগুলিও ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে ‘মৌলানা জাফর আলি খান চক’ নামে পরিচিত স্থানটি তার আদি নাম ‘লক্ষ্মী চক’ ফিরে পেয়েছে। ‘স্যার আগা খান রোড’ পুনরায় ‘ডেভিস রোড’ এবং ‘ফাতিমা জিন্নাহ রোড’ রূপান্তরিত হয়েছে ‘কুইন্স রোড’-এ। এমনকি বিখ্যাত ‘বাগ-এ-জিন্নাহ’ উদ্যানটি তার পুরনো ঔপনিবেশিক নাম ‘লরেন্স গার্ডেন’ হিসেবে পুনশ্চ আত্মপ্রকাশ করেছে।

জনমানসের আবেগ ও সাংস্কৃতিক বহুমাত্রিকতা

প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রধান কারণ হলো লাহোরের সাধারণ মানুষের আবেগ। স্থানীয় গবেষক ও সমাজকর্মীদের মতে, দেশভাগের পর সরকারি নথিতে বা সাইনবোর্ডে নাম বদলে দেওয়া হলেও লাহোরের সাধারণ মানুষ, রিকশাচালক, দোকানদার থেকে শুরু করে সাধারণ বাসিন্দারা দৈনন্দিন কথ্য ভাষায় সবসময় পুরনো নামগুলিই ব্যবহার করে এসেছেন। ফলে শত চেষ্টার পরেও জনমানস থেকে লক্ষ্মী চক বা কৃষাণ নগরের মতো নামগুলি মুছে ফেলা যায়নি।

লাহোর মানবাধিকার কাউন্সিলের মতে, মুসলিম, শিখ, হিন্দু, খ্রিস্টান এবং ঔপনিবেশিক—এই সবকিছুর মিশ্রণেই লাহোরের আসল বহুমাত্রিক পরিচয়। এই ঐতিহাসিক সত্যকে স্বীকার করেই প্রশাসন এই সাংস্কৃতিক পুনরুদ্ধারের পথে হেঁটেছে।

সম্ভাব্য প্রভাব ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগের ফলে আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানের একটি সহনশীল ও উদার ভাবমূর্তি তৈরি হবে। উগ্রপন্থার খোলস থেকে বেরিয়ে সমাজ যে ক্রমশ উন্মুক্তমনা হচ্ছে, এই সিদ্ধান্ত তারই প্রমাণ। নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি লাহোরে প্রায় শতাধিক ঐতিহ্যবাহী ভবন, মহারাজা রণজিৎ সিংহের আমলের শিখ স্থাপত্য ও গির্জা সংস্কারের কাজও শুরু হয়েছে।

পাশাপাশি, লাহোরের ঐতিহাসিক মিন্টো পার্ক (বর্তমান গ্রেটার ইকবাল পার্ক) সংলগ্ন পুরনো ক্রিকেট মাঠ ও ঐতিহ্যবাহী কুস্তি আখড়াগুলিও পুনরুজ্জীবিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা দেশভাগের আগে লালা অমরনাথের মতো ভারতীয় কিংবদন্তি এবং গামা পালোয়ানের মতো বিশ্বখ্যাত কুস্তিগিরদের স্মৃতি বিজড়িত ছিল। অতীতের এই গৌরবময় মিশ্র সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা দুই দেশের ইতিহাস অনুরাগীদের মধ্যেও ইতিবাচক সাড়া ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *