পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ মামলার ভবিষ্যৎ কি শুধুই অন্ধকার! নতুন সরকারের অবস্থান জানতে চাইল হাইকোর্ট

আইনি জটিলতার বেড়াজালে আটকে আরও একবার ঝুলেই রইল রাজ্যের হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থীর ভাগ্য। রাজ্য পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগ প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে এবার বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হলো কলকাতা হাইকোর্টে। বিগত তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের জমানায় শুরু হওয়া এই নিয়োগের মেধা তালিকা ও সংরক্ষণ নীতিতে মারাত্মক কারচুপি এবং কাট-অফ মার্কসে ব্যাপক গোলমালের অভিযোগ তুলে আদালতে মামলা দায়ের হয়েছিল। বুধবার (২০ মে) সেই মামলার শুনানিতেই কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি অমৃতা সিনহা এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছেন। রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে যাওয়ার পর, এই নিয়োগ সংক্রান্ত জট নিয়ে এবার নতুন বিজেপি সরকারের সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানতে চাইল উচ্চ আদালত। আগামী ৮ জুন এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
মেধা তালিকা ও কাট-অফ মার্কসে মারাত্মক কারচুপির অভিযোগ
২০২৪ সালের পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে মোট শূন্যপদ ছিল ১১ হাজার ৭৪৯টি, যার পরীক্ষা ও আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় ২০২৫ সালে। কিন্তু পরীক্ষার ফল এবং মেধা তালিকা সামনে আসতেই চাকরিপ্রার্থীদের একাংশের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে, ‘বিশেষ ছাড়’ বা স্পেশাল এক্সেম্পটেড ক্যাটেগরির অধীনে বরাদ্দ থাকা মোট ১ হাজার ৭টি শূন্যপদের মধ্যে মেধা তালিকায় মাত্র ১০ জন পরীক্ষার্থীর নাম প্রকাশ করা হয়েছিল। মামলাকারীদের আইনজীবীদের দাবি, এই বিশেষ ছাড় ক্যাটেগরির অধীনে থাকা ওবিসি-বি, সিভিক ভলান্টিয়ার, এনভিএফ এবং ভিলেজ পুলিশ ক্যাটেগরিগুলির ক্ষেত্রে কাট-অফ মার্কস ইচ্ছাকৃতভাবে এতটা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, যাতে কোনও সাধারণ যোগ্য প্রার্থীই সেই নম্বর ছুঁতে না পারেন। এর পরবর্তী ধাপে এক চক্রান্তের মাধ্যমে সেগুলিকে সাধারণ বা ‘জেনারেল ক্যাটেগরি’তে বদলে দেওয়া হয়, যা রাজ্যের প্রচলিত সংরক্ষণ নীতি ও আইনি নিয়মের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।
নির্বাচনী ফায়দা ও সম্ভাব্য প্রভাব
আদালতের অন্দরে মামলাকারীরা আরও এক বিস্ফোরক দাবি করে জানিয়েছেন, এই ১১ হাজার ৭৪৯টি শূন্যপদে তড়িঘড়ি নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পেছনে আসলে এক মস্ত বড় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। সদ্য সমাপ্ত রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি জারি হওয়ার আগেই বিদায়ী সরকার তড়িঘড়ি এই বিপুল পরিমাণ কনস্টেবল পদে চূড়ান্ত নিয়োগপত্র দিতে চেয়েছিল, যাতে ভোটের বাক্সে তার সরাসরি ফায়দা তোলা যায়। কিন্তু মাঝপথেই এই অস্বচ্ছ মেধা তালিকা ও কাট-অফ বিতর্কের জেরে পুরো বিষয়টি আদালতের দোরগোড়ায় পৌঁছয়। ফলে হাজার হাজার যোগ্য চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যৎ এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে এবং পুলিশ প্রশাসনের কর্মক্ষমতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ধাক্কা খেয়েছে।
বর্তমানে রাজ্যে ক্ষমতার অলিন্দে পালাবদল ঘটে গিয়েছে এবং নবান্নের রাশ এখন নতুন সরকারের হাতে। এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল জমানার এই বিতর্কিত পুলিশ নিয়োগ নিয়ে নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার কী ভাবছে—তারা এই নিয়োগ বাতিল করে নতুন করে স্বচ্ছ পরীক্ষা নিতে চায় নাকি এই মেধা তালিকাকেই সংশোধন করতে চায়—সেই অবস্থান স্পষ্ট করতে নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি অমৃতা সিনহা। আগামী ৮ জুন নতুন সরকারের হলফনামা বা জবাবের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হবে রাজ্য পুলিশের এই মেগা কনস্টেবল নিয়োগের ভাগ্য।