কুরবানি ইদের আগে গবাদি পশু জবাই নিয়ে শুভেন্দু সরকারের কড়া নির্দেশিকা, চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টে যৌথ মামলা মহুয়া ও আখরুজ্জামানের

সামনেই কুরবানি ইদ (বকরি ইদ)। আর তার আগেই রাজ্যে পশুহত্যা ও গবাদি পশু জবাই সংক্রান্ত এক কঠোর নির্দেশিকা জারি করেছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নতুন বিজেপি সরকার। এবার রাজ্য সরকারের সেই বিতর্কিত সরকারি নির্দেশিকাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করলেন তৃণমূল কংগ্রেসের কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্র এবং রঘুনাথগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক আখরুজ্জামান।

বুধবার কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার উল্লেখ করা হয়। আদালত জানিয়েছে, একই বিষয়ে একাধিক মামলা দায়ের হওয়ায় বৃহস্পতিবার সবকটি পিটিশনের একসঙ্গে শুনানি করা হবে।

১৯৫০ সালের আইনের ১২ নম্বর ধারাকে হাতিয়ার করে ছাড়ের আর্জি মহুয়ার

পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার গঠনের পর ১৯৫০ সালের ‘প্রাণিসম্পদ সংরক্ষণ আইন’ (The West Bengal Animal Preservation Act, 1950) কড়াভাবে কার্যকর করার লক্ষ্যে গত ১৩ই মে একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। তৃণমূলের দাবি, এই নির্দেশিকার ফলে উৎসবের মরসুমে ধর্মীয় রীতিনীতি পালনে বড়সড় জটিলতা তৈরি হবে।

বুধবার হাইকোর্ট চত্বরে দাঁড়িয়ে এই আইনি লড়াই প্রসঙ্গে সাংসদ মহুয়া মৈত্র সরকারের তীব্র সমালোচনা করে সংবাদমাধ্যমের সামনে বলেন:

“রাজ্য সরকার হঠাৎ করে গবাদি পশু জবাই নিয়ে একটা নতুন বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। কিন্তু বকরি ইদ মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে অত্যন্ত পবিত্র এবং ধর্মীয় কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎসব। আমাদের বক্তব্য হলো, এই মূল আইনের ১২ নম্বর ধারায় (Section 12) স্পষ্ট একটি বিশেষ ছাড় বা এক্সেম্পশনের কথা বলা রয়েছে। আমরা সেই আইনি ১২ নম্বর ধারাকে সামনে রেখেই আদালতের কাছে ছাড়ের আর্জি জানাচ্ছি।”

গরু বাদ দিয়ে মোষ বা বলদের অনুমতি দেওয়া হোক: তৃণমূল বিধায়ক ও সাংসদ

আইনি জটিলতা ও রাজ্যের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার স্বার্থে তৃণমূল নেতৃত্বের তরফে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ‘মধ্যপন্থা’ বা সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে আদালতের কাছে। মহুয়া মৈত্র ও বিধায়ক আখরুজ্জামান স্পষ্ট জানান, ধর্মীয় ভাবাবেগ বজায় রেখে তাঁরা আইনকে সম্মান জানাতেও প্রস্তুত, তবে উৎসবের দিনগুলিতে কিছুটা নমনীয়তা প্রয়োজন।

আদালতের কাছে তাঁদের বিশেষ আর্জি:

  • বিকল্প পশুর অনুমতি: শুধুমাত্র এই উৎসবের দিন ক’টার জন্য যদি নিয়মে কিছুটা শিথিলতা এনে গরুকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে মোষ (Buffalo) কিংবা বলদ (Bullock) কুরবানি বা জবাই করার ছাড়পত্র দেওয়া হয়, তবে ধর্মীয় আচারও বজায় থাকবে এবং আইনও লঙ্ঘিত হবে না।
  • অর্থনৈতিক ধাক্কার আশঙ্কা: তৃণমূল শিবিরের দাবি, হঠাৎ করে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি হলে রাজ্যের পশুপালন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত লক্ষ লক্ষ প্রান্তিক খামারি, ব্যবসায়ী এবং মাংস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত গরিব মানুষ চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়বেন।

সরকারের নিয়ম মেনেই ইদ পালনের বার্তা অল বেঙ্গল ইমাম অ্যাসোসিয়েশনের

এদিকে, হাইকোর্টে এই আইনি টানাপোড়েনের মাঝেই ‘অল বেঙ্গল ইমাম মোয়াজ্জিন অ্যাসোসিয়েশনের’ সম্পাদক মমিনুর রহমান জলপাইগুড়িতে এক সাংবাদিক বৈঠক করে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার বার্তা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, “রাজ্য সরকারের দেওয়া নির্দেশিকা ও প্রশাসনিক গাইডলাইন সম্পূর্ণভাবে মেনেই রাজ্যে কুরবানি ইদ পালন করা হবে। ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের পাশাপাশি আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের আনন্দ যেন অন্য কারও নিরানন্দের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।”

ছাব্বিশের মসনদ বদলের পর শুভেন্দু সরকারের একের পর এক কড়া অধ্যাদেশ ও আইনের মুখে নবান্ন বনাম কালীঘাটের লড়াই এবার কুরবানি ইদের ধর্মীয় ও আইনি বৃত্তে প্রবেশ করল। এখন দেখার, বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ তৃণমূলের এই ‘১২ নম্বর ধারার’ ব্যাখ্যার প্রেক্ষিতে রাজ্য সরকারকে কোনো অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেয় নাকি নতুন বিজ্ঞপ্তি বহাল রাখে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *