‘ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট’ আজ থেকেই রাজ্যে কার্যকর অনুপ্রবেশকারী হঠাও আইন

পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত সুরক্ষা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং নাগরিকত্ব ইস্যুতে এবার সবথেকে বড় এবং চূড়ান্ত আইনি পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার নবান্ন থেকে এক হাই-প্রোফাইল সাংবাদিক বৈঠকে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, এতদিন কেন্দ্রীয় সরকারের যে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট’ (Detect, Delete, Deport) নীতি এ রাজ্যে আটকে ছিল, আজ অর্থাৎ ২০শে মে থেকেই তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে কার্যকর করা হলো।
মুখ্যমন্ত্রীর এই চরম হুঁশিয়ারি ও কড়া প্রশাসনিক বার্তার পর সীমান্ত জেলাগুলি-সহ গোটা রাজ্যের রাজনীতিতে এক তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে। ছাব্বিশের মসনদ বদলের পর অনুপ্রবেশ রুখতে নবান্নের এই পদক্ষেপকে দেশের স্বার্থে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখছে ওয়াকিবহাল মহল।
ডিজিপি ও স্বরাষ্ট্র সচিবকে নির্দেশ, কার্যকর ‘ডিপোর্ট’ আইন
বিগত তৃণমূল সরকারের ভোটব্যাঙ্কের তোষণ নীতিকে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে দেন, আইনের চোখে অবৈধ নাগরিকদের জন্য বাংলায় আর কোনো জায়গা নেই। তিনি বলেন:
“নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ (CAA)-র আওতার বাইরে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা সম্পূর্ণভাবে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। দেশের স্বার্থে এবং পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থে আজ থেকেই আমরা এই ‘ডিপোর্ট’ আইন কার্যকর করলাম। রাজ্য পুলিশ এই সমস্ত অনুপ্রবেশকারীদের সরাসরি গ্রেফতার ও আটক করবে এবং বিএসএফের হাতে তুলে দেবে। বিএসএফ এরপর বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) সাথে কথা বলে তাঁদের নিজেদের দেশে ফেরত বা ডিপোর্ট করার ব্যবস্থা করবে। রাজ্যের ডিজিপি এবং স্বরাষ্ট্র সচিবকে ইতিমধ্যেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে সীমান্ত লাগোয়া সমস্ত থানায় আজ থেকেই এই প্রক্রিয়া কঠোরভাবে চালু করতে হবে।”
যাঁরা ‘সিএএ’-র আওতায়, তাঁদের ভয়ের কোনো কারণ নেই
এই মেগা অভিযানের ঘোষণার মাঝেই রাজ্যের উদ্বাস্তু ও শরণার্থী ভাই-বোনদের বড়সড় আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, ধর্মীয় তাড়না বা অন্য কোনো কারণে ওপার থেকে এসে যাঁরা ভারতের ‘সিএএ’ আইনের সমস্ত শর্ত ও পরিধির মধ্যে পড়েছেন, তাঁদের বিন্দুমাত্র আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। শুভেন্দু অধিকারীর কথায়, “শরণার্থীদের কোনো রকম হেনস্থার মুখে পড়তে হবে না, এই সরকার তাঁদের পাশে রয়েছে। তবে সিএএ-র বাইরে থাকা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের কোনোভাবেই রেয়াত করা হবে না।”
কাঁটাতারের জন্য বিএসএফ-এর হাতে ২৭ কিমি জমি হস্তান্তর
অনুপ্রবেশের রাস্তা চিরতরে বন্ধ করতে শুধুমাত্র মুখের কথায় নয়, প্রশাসনিক কাজেও নজিরবিহীন গতি দেখিয়েছে নতুন সরকার। মুখ্যমন্ত্রী জানান, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ২৭ কিলোমিটার জমি চিহ্নিত করে তা বিএসএফ (BSF)-এর হাতে তুলে দিয়েছে। ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তকে নিশ্ছিদ্র ও সুরক্ষিত করে তুলতেই এই যুদ্ধকালীন তৎপরতা।
‘মমতা সরকার চাইলেই ৫৫০ কিমি জমি দিতে পারত’
পশ্চিমবঙ্গের আন্তর্জাতিক সীমান্তের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক জট নিয়ে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তীব্র নিশানা করেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে দাবি করেন:
- অরক্ষিত সীমান্ত: ভারতের সাথে বাংলাদেশের মোট ২,2০০ কিমি সীমান্তের মধ্যে ১,৬০০ কিমি অংশে কাঁটাতার রয়েছে। বাকি ৬০০ কিমি অংশ দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ খোলা ও অরক্ষিত অবস্থায় পড়েছিল।
- তোষামদের রাজনীতি: এই ৬০০ কিমি-র মধ্যে অন্তত ৫৫০ কিমি জমি রাজ্য সরকার চাইলেই সহজে অধিগ্রহণ করে বিএসএফ-এর হাতে তুলে দিতে পারত। প্রতিবেশী অন্যান্য রাজ্যগুলি বিএসএফ-এর চাহিদা মতো জমি দিলেও, মমতা সরকার শুধুমাত্র ‘তোষামদের রাজনীতি’র কারণে বছরের পর বছর এই জমি আটকে রেখে সীমান্তকে খোলা রেখেছিল।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে সল্টলেক ও কালীঘাটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পত্তিতে পুরসভার বুলডোজার নোটিশ এবং অন্যদিকে নদিয়ায় মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে এফআইআর নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস যখন চারদিক থেকে কোণঠাসা, ঠিক তখনই শুভেন্দু অধিকারী ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ ও ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যুকে সামনে এনে রাজদণ্ডকে আরও শক্ত করলেন। এখন দেখার, নবান্নের এই নয়া কড়া ফরমানের পর সীমান্ত লাগোয়া থানাগুলিতে রাজ্য পুলিশ ও বিএসএফ-এর যৌথ স্ক্রুটিনি আগামী দিনে কী রূপ নেয়।