নোটিশ কাণ্ডে এবার ‘অভিষেক’ তত্ত্ব থেকে দূরত্ব ফিরহাদ-কুণালের, ‘ব্যক্তিগত ব্যাপার’ বলে দায় ঠেললেন দলীয় নেতৃত্বই!

নোটিশ কাণ্ডে এবার ‘অভিষেক’ তত্ত্ব থেকে দূরত্ব ফিরহাদ-কুণালের, ‘ব্যক্তিগত ব্যাপার’ বলে দায় ঠেললেন দলীয় নেতৃত্বই!

কালীঘাটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’ ও তাঁর মায়ের নামে থাকা সম্পত্তিতে কলকাতা পুরসভার ৭ দিনের ‘বুলডোজার’ হুঁশিয়ারি সম্বলিত নোটিশ টাঙানোর পর, এবার তৃণমূলের অন্দরের ফাটল সম্পূর্ণ প্রকাশ্যে চলে এলো। দলের ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ তথা সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের এই চরম সংকটকালে তাঁর পাশে দাঁড়ানো তো দূরস্ত, বরং নজিরবিহীনভাবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘাড়েই পুরো দায় ঠেলে দিলেন কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম এবং তৃণমূলের প্রবীণ নেতা কুণাল ঘোষ। বুধবার এই নোটিশ বিতর্ক নিয়ে প্রশ্ন করা হলে দুজনেই স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এর সাথে দল বা প্রশাসনের কোনো যোগ নেই— এটি সম্পূর্ণ ওঁর ব্যক্তিগত বিষয়।

‘ওঁর ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমি কোনো কথা বলব না’, দায় এড়ালেন মেয়র ফিরহাদ

যে কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের আইনের ৪০১ ধারায় বুধবার বিকেলে অভিষেকের বাড়িতে নোটিশ টাঙানো হয়েছে, সেই পুরসভারই প্রশাসনিক প্রধান তথা মেয়র ফিরহাদ হাকিমের মন্তব্য রাজনৈতিক মহলকে সবচেয়ে বেশি চমকে দিয়েছে। নিজের ঘনিষ্ঠ কাউন্সিলর দেবলীনা বিশ্বাসের ইস্তফার পর এমনিতেই চাপে রয়েছেন মেয়র। আজ এই হাই-প্রোফাইল নোটিশ কাণ্ড নিয়ে সংবাদমাধ্যম তাঁকে ছেঁকে ধরলে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ফিরহাদ হাকিম বলেন:

“ওঁর (অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের) ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমি কোনো কথা বলতে পারব না।”

মেয়রের এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য প্রমাণ করছে যে, নতুন শুভেন্দু অধিকারী সরকারের আইনি ও প্রশাসনিক কড়াকড়ির মুখে দলের ‘ডেপুটি’র আইনি ঝামেলার দায় নিজের কাঁধে নিয়ে কোনোভাবেই ‘বিষ পান’ করতে রাজি নন ফিরহাদ।

কটা সম্পত্তি তা একমাত্র তিনিই বলতে পারবেন: কুণাল ঘোষ

অন্যদিকে, দলের অন্যতম প্রধান মুখ কুণাল ঘোষও এই ইস্যুতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কোনো রাজনৈতিক রক্ষাকবচ বা ‘ক্লিন চিট’ দিতে চাইলেন না। বরং তাঁর সম্পত্তির হিসাব নিয়ে কার্যত ধোঁয়াশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন কুণাল।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অত্যন্ত চাঁছাছোলা ভাষায় কুণাল ঘোষ বলেন:

“কার বাড়িতে নোটিশ গিয়েছে, কটা নোটিশ গিয়েছে কিংবা কলকাতায় তাঁর আসলে কটি সম্পত্তি রয়েছে— এসব প্রশ্নের উত্তর একমাত্র তিনিই (অভিষেক) ভালো দিতে পারবেন। অথবা তাঁর নিযুক্ত কোনো আইনজীবী এই বিষয়ে বলতে পারবেন, যাঁকে কেন্দ্র করে এত বড় বিতর্কের সৃষ্টি হচ্ছে।”

তাসের ঘরের মতো ভাঙছে ঘাসফুলের একতা, কটাক্ষ বিরোধীদের

ফলতার বাহুবলী জাহাঙ্গির খানের ভোটযুদ্ধ থেকে পলায়ন, পুর নিয়োগ দুর্নীতিতে দেবরাজ চক্রবর্তীর গ্রেফতারি, এবং উলুবেড়িয়ার বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আইপ্যাকের বাবুদের’ বিরুদ্ধে করা বিস্ফোরক বিদ্রোহের পর এবার ফিরহাদ-কুণালের এই দূরত্ব তৈরি করা তৃণমূলের শীর্ষ স্তরের সমন্বয়ের অভাবকে নগ্ন করে দিল।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ছাব্বিশের মসনদ বদলের পর নতুন সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে পুরসভার কড়া অ্যাকশনের জেরে তৃণমূলের হেভিওয়েট নেতারা এখন প্রত্যেকেই নিজেদের পিঠ বাঁচাতে ব্যস্ত। আর সেই কারণেই দলনেত্রীর পাড়ায় পুরসভার কর্মীরা নোটিশ টাঙিয়ে দিয়ে আসার পরেও, দলের অন্দর থেকে অভিষেকের পক্ষে কোনো জোরালো প্রতিরোধ বা রাজনৈতিক বিবৃতি সামনে আসছে না। আদালতের আইনি লড়াইয়ে নামার আগে দলের সহযোদ্ধাদের এমন ‘হাত ধুয়ে ফেলা’ অবস্থান ডায়মন্ড হারবারের বিদায়ী সাংসদের অস্বস্তি যে এক ধাক্কায় পাহাড়প্রমাণ করে তুলল, তা বলাই বাহুল্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *