৯৬,৩১৪ কোটির বিনিয়োগের শর্ত! মার্কিন আদালতে সব জালিয়াতির মামলা থেকে সপরিবারে মুক্তি পেলেন গৌতম আদানি
বিশ্বের শিল্পমহল এবং শেয়ার বাজারের ইতিহাসের সবথেকে বড় এবং নাটকীয় মোড় চলে এলো ১৯শে মে, মঙ্গলবার রাতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ দিন ধরে চলা ফৌজদারি জালিয়াতি, ঘুষ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের মেগা মামলা থেকে সম্পূর্ণ সসম্মানে মুক্তি পেলেন ভারতের শীর্ষ ধনকুবের তথা আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গৌতম আদানি এবং তাঁর ভাইপো সাগর আদানি। মার্কিন জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট (DoJ) নিউ ইয়র্কের জেলা আদালত থেকে আদানিদের বিরুদ্ধে আনা সমস্ত রকম ফৌজদারি অভিযোগ পাকাপাকিভাবে তুলে নিয়েছে। প্রসিকিউটরদের স্পষ্ট স্বীকারোক্তি— আদানিদের বিরুদ্ধে ওঠা কোনো অভিযোগেরই পর্যাপ্ত বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি।
ছাব্বিশের মে মাসে এসে এই হাই-প্রোফাইল মামলাটির সম্পূর্ণ অবসান আদানি গ্রুপের বিশ্বজুড়ে পরিকাঠামো ও ব্যবসা সম্প্রসারণের পথে থাকা সমস্ত আইনি কাঁটা এক ধাক্কায় দূর করে দিল। তবে এই সম্পূর্ণ আইনি রফাসূত্র ও মুক্তির পেছনে রয়েছে ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯৬,৩১৪ কোটি টাকা ($১১.৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিনিয়োগের এক বিশাল আন্তর্জাতিক চুক্তি ও জরিমানা নিষ্পত্তির শর্ত।
বিরলতম জয়! আর কখনো তোলা যাবে না এই অভিযোগ
মার্কিন ফৌজদারি কার্যবিধিতে ‘ডিসমিসড উইথ প্রেজুডিস’ (Dismissed with prejudice) বা স্থায়ীভাবে অভিযোগ খারিজ হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। এর সহজ অর্থ হলো— বিস্তৃত পর্যালোচনার পর মার্কিন প্রশাসন মেনে নিয়েছে যে এই মামলা চালিয়ে যাওয়ার আর কোনো যৌক্তিকতা নেই এবং ভবিষ্যতে আর কখনোই আদানির বিরুদ্ধে এই একই অভিযোগ তোলা যাবে না।
মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (SEC) এবং জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের এই পিছু হটার মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দুটি বড় বিষয়:
১. মার্কিন এক্তিয়ারের অভাব: আদানিদের আইনজীবী দল আদালতে জোরালো যুক্তি দেন যে, কথিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ঘটনাটি ‘কেবলই ভারতে’ ঘটেছে এবং এর সাথে মার্কিন শেয়ার বাজারের কোনো যোগসূত্র বা লেনদেন ছিল না। ফলে মার্কিন আইনের পরিধি জোর করে অন্য দেশের ওপর চাপানো হচ্ছিল।
২. তথ্যের অভাব ও কোনো ক্ষতি না হওয়া: মার্কিন বিনিয়োগকারীদের কোনো রকম আর্থিক ক্ষতি হয়নি এবং সমস্ত বন্ডের বাধ্যবাধকতা যথাসময়ে পূরণ করা হয়েছে। খোদ মার্কিন এসইসি-র প্রাক্তন কমিশনার লরা উঙ্গার এই মামলার ভিত্তি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে জানান, যে ঘুষের অভিযোগ খোদ ভারতেই প্রমাণিত হয়নি, তার ওপর ভিত্তি করে আমেরিকায় জালিয়াতির মামলা সাজানো ভুল ছিল।
কীসের বিনিময়ে এই মেগা রফা? কোটি কোটি ডলারের জরিমানা
নিউ ইয়র্কের ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্টের জেলা আদালতের নথি অনুযায়ী, দোষ স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটিই না করে (Neither admit nor deny) আদানি গ্রুপ এবং তার শীর্ষ কর্তারা মার্কিন একাধিক নিয়ামক সংস্থার সাথে এই মেগা আইনি জট মিটিয়েছেন:
- গৌতম ও সাগর আদানির সেটলমেন্ট: ভারতের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগকারীদের ডিসক্লোজার সংক্রান্ত জটিলতা মেটাতে ব্যক্তিগতভাবে গৌতম আদানি ৬০ লক্ষ ডলার এবং সাগর আদানি ১ কোটি ২০ লক্ষ ডলার দিতে সম্মত হয়েছেন।
- মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি: ইরান থেকে এলপিজি আমদানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের যে গুরুতর অভিযোগ আদানিদের বিরুদ্ধে তুলেছিল ইউএস ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট (OFAC), তাও প্রত্যাহার করা হয়েছে। এই জট কাটাতে তদন্তে ‘সম্পূর্ণ সহযোগিতা’ এবং ‘স্বপ্রণোদিত তথ্য’ প্রকাশের পাশাপাশি ২৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার জরিমানা দিতে সম্মত হয়েছে আদানি গোষ্ঠী।
বিশ্বজুড়ে আদানিদের জয়জয়কার, স্বস্তিতে ভারতীয় বাজার
২০২৪ সালের শেষ দিকে আদানির বিরুদ্ধে ২৬৫ মিলিয়ন ডলারের কথিত ঘুষের যে ব্লু-প্রিন্টের অভিযোগ এনেছিল মার্কিন সংস্থাগুলি, তা এক লহমায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। ‘সুলিভান অ্যান্ড ক্রমওয়েল’, ‘নিক্সন পিবডি’, ‘হেকার ফিঙ্ক’-এর মতো বিশ্বের প্রথম সারির ৫টি মার্কিন ল ফার্মের ঝানু আইনজীবীদের কয়েক মাসের আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে জিতল আদানি গ্রুপ। শুরু থেকেই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে আদানি গোষ্ঠী জানিয়েছিল যে তারা ‘সততার সঙ্গে’ ব্যবসা করে। ছাব্বিশের মে মাসের এই ঐতিহাসিক রায় ও ৯৬,৩১৪ কোটি টাকার মেগা বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত হওয়া ভারতীয় অর্থনীতি ও শেয়ার বাজারে আদানিদের শেয়ারে এক নতুন রেকর্ডের ঝড় তুলতে চলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।