হরমুজের গভীরে এবার ইন্টারনেটের ‘নিয়ন্ত্রণ’ চায় তেহরান! গুগল-মেটাকে শুল্ক দেওয়ার হুঁশিয়ারি ইরানের, আশঙ্কায় বিশ্ব অর্থনীতি

হরমুজের গভীরে এবার ইন্টারনেটের ‘নিয়ন্ত্রণ’ চায় তেহরান! গুগল-মেটাকে শুল্ক দেওয়ার হুঁশিয়ারি ইরানের, আশঙ্কায় বিশ্ব অর্থনীতি

ভূ-রাজনৈতিকভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তবে এবার অপরিশোধিত খনিজ তেল বা ট্যাঙ্কার আটক নয়, বিশ্ব অর্থনীতির একবারে কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত হানার ছক কষছে তেহরান। হরমুজ প্রণালীর তলদেশে বিছিয়ে থাকা আন্তর্জাতিক ফাইবার-অপটিক সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্কের ওপর এবার সরাসরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছে ইরান।

উপসাগরীয় অঞ্চলে সফল নৌ-অবরোধের পর আত্মবিশ্বাসী ইরান এবার গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজনের মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি সংস্থাগুলির কাছে ‘ইন্টারনেট রেন্ট’ বা ল্যান্ডিং শুল্ক দাবি করে এক পরোক্ষ হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তেহরানের স্পষ্ট বার্তা— এই শুল্ক বা ফি না মেটালে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট পরিষেবা বিঘ্নিত করা হতে পারে।

এক্স পোস্টে সামরিক ঘোষণা: কেবলের ওপর বসবে ইরানি শুল্ক

গত সপ্তাহে ইরানের সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি নিজের অফিশিয়াল এক্স হ্যান্ডেল থেকে একটি বিস্ফোরক ঘোষণা করেন। তিনি স্পষ্ট জানান, “আমরা ইন্টারনেট কেবলের ওপর ফি বা শুল্ক আরোপ করব।”

ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (IRGC) সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানের আইনপ্রণেতারা ইতিমধ্যেই আরব দেশগুলির সাথে ইউরোপ ও এশিয়াকে সংযুক্তকারী সাবমেরিন কেবলগুলিকে লক্ষ্য করে একটি বিশেষ বিল বা আইনি রূপরেখা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। এই পরিকল্পনার মূল শর্তগুলি হলো:

  • লাইসেন্স ফি: গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা এবং অ্যামাজনের মতো বিগ-টেক সংস্থাগুলিকে হরমুজের নিচ দিয়ে ডেটা পারাপারের জন্য ইরানকে নিয়মিত লাইসেন্স ফি দিতে হবে।
  • একচেটিয়া রক্ষণাবেক্ষণ: সমুদ্রের তলদেশের এই কেবলগুলির মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের (Maintenance) সমস্ত একচেটিয়া অধিকার শুধুমাত্র ইরানি কো ম্পা নিগুলিকেই দিতে হবে।

তবে কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার (US Sanctions) কারণে এই সমস্ত মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টরা ইরানকে আদৌ কোনো অর্থ দিতে পারবে কিনা, তা নিয়ে বড়সড় আইনি ধোঁয়াশা রয়েছে। ফলে অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থাই একে ইরানের একটি ‘রাজনৈতিক চাল’ হিসেবে দেখছে।

কেন এই সাবমেরিন কেবলগুলি বিশ্ব অর্থনীতির ধমনী?

হরমুজ প্রণালীর তলদেশ দিয়ে যাওয়া এই সরু ফাইবার-অপটিক তারগুলি হাজার হাজার কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। বিশ্বব্যাপী মোট ইন্টারনেট ট্রাফিকের সিংহভাগ, ডিজিটাল ব্যাঙ্কিং লেনদেন, ই-মেইল, ভিডিও কল থেকে শুরু করে আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ভিত্তিক পরিষেবার প্রায় সমস্ত ডেটা এই তারগুলির মাধ্যমেই পরিবাহিত হয়।

ভূ-রাজনৈতিক ও জ্বালানি বিশ্লেষক মাশা কোটিন রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, “এই কেবলগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অর্থ হলো ইন্টারনেটের গতি কমে যাওয়া, সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং ই-কমার্স ও বৈশ্বিক আর্থিক লেনদেন থমকে যাওয়া, যা মুহূর্তের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।” উল্লেখ্য, আমাজন, গুগল ও মাইক্রোসফট ইতিমধ্যেই সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো উপসাগরীয় দেশগুলিতে বিশাল ডেটা সেন্টার গড়ে তুলতে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে, যা এখন ইরানের এই নতুন কৌশলের কারণে ঝুঁকির মুখে।

হরমুজের নিচে রয়েছে ভারতের লাইফলাইনও

ক্যাবল-সংক্রান্ত তথ্যের নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক উৎস ‘টেলিজিওগ্রাফি’ (Telegeography)-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরে বর্তমানে বেশ কয়েকটি অতি-গুরুত্বপূর্ণ সাব-সি ক্যাবল সক্রিয় রয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

  • AAE-1 (Asia-Africa-Europe 1)
  • FALCON
  • Gulf Bridge International Cable System
  • Tata-TGN Gulf

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ক্যাবল লাইনগুলি সরাসরি ভারতের আন্তর্জাতিক ডেটা সংযোগ এবং দ্রুতগতির ইন্টারনেট ব্যবস্থার সাথে যুক্ত। ফলে হরমুজে ইরানের এই নয়া কড়াকড়ি ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির ওপরেও পরোক্ষ চাপ তৈরি করতে পারে।

ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ ও সাবমেরিন কেবলের অন্যান্য ঝুঁকি

ইন্টারন্যাশনাল ক্যাবল প্রোটেকশন কমিটি (ICPC)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে সাবমেরিন টেলিকমিউনিকেশন কেবলের দৈর্ঘ্য ১০ লক্ষ কিলোমিটার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১৭ লক্ষ কিলোমিটারে পৌঁছেছে। তবে এই বিশাল নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষকতায় অন্তর্ঘাত বা তার কেটে দেওয়া এখন আন্তর্জাতিক সুরক্ষায় বড় হুমকি হলেও, পরিসংখ্যানে দেখা গেছে সাবমেরিন কেবলের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ত্রুটিই ঘটে মানুষের অসাবধানতা, জাহাজের নোঙর কিংবা সমুদ্রতলের প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন— ভূমিকম্প, স্রোত ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে।

ছাব্বিশের এই উত্তপ্ত আন্তর্জাতিক আবহে একদিকে যখন ওপেক (OPEC) দেশগুলির তেল রাজনীতি নিয়ে রেষারেষি চলছে, ঠিক তখনই ইরানের এই ‘ডিজিটাল তথ্য প্রবাহের ওপর রাজস্ব আদায়ের’ পরিকল্পনা বিশ্বজুড়ে এক নতুন ধরণের ‘সাইবার ও ভূ-রাজনৈতিক’ সংঘাতের জন্ম দিল। এখন দেখার, ওয়াশিংটন এবং বিশ্বের প্রযুক্তি জায়ান্টগুলি তেহরানের এই হুঁশিয়ারির জবাবে কী পদক্ষেপ নেয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *