দ্বারকেশ্বরের তীরে এবার ‘যোগীর মেজাজে’ শুভেন্দুর বিধায়ক, বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো তৃণমূলের ‘অবৈধ’ বালিখাদানের অফিস!

দ্বারকেশ্বরের তীরে এবার ‘যোগীর মেজাজে’ শুভেন্দুর বিধায়ক, বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো তৃণমূলের ‘অবৈধ’ বালিখাদানের অফিস!

রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বেআইনি বালি মাফিয়া এবং রাজস্ব চোরদের বিরুদ্ধে এবার সবথেকে বড় ও হাই-প্রোফাইল অ্যাকশন শুরু হলো বাঁকুড়া জেলায়। ঠিক যেভাবে কলকাতা ও সল্টলেকে তৃণমূল নেতাদের তোলাবাজি সিন্ডিকেট ও বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে পুরসভার বুলডোজার নোটিশ জারি হয়েছে, ঠিক একই কায়দায় এবার সরাসরি মাফিয়াদের ডেরায় বুলডোজার (Bulldozer) নিয়ে হাজির হলেন বিজেপি বিধায়ক।

মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বাঁকুড়ার ছাতনা থানার কাঁকি গ্রামে দ্বারকেশ্বর ও ডাংরা নদীর মিলনস্থলে চলা এক বিশাল ‘অবৈধ’ বালিখাদানে বুলডোজার চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো বালি কারবারিদের অস্থায়ী অফিসঘর। একই সাথে মাফিয়াদের কোটি কোটি টাকার পে-লোডার, ট্র্যাক্টর-সহ ল্যাপটপ ও নগদ টাকা বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ ও প্রশাসন।

ছাব্বিশের মসনদ বদলের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘মাফিয়া-রাজ খতম’ করার কড়া নির্দেশের পর জেলা স্তরে এটিই প্রথম কোনো বালিঘাটে বুলডোজার অভিযান বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

বিধায়কের উপস্থিতিতে স্পটেই তলব পুলিশ ও ভূমি সংস্কার দফতরকে

স্থানীয় সূত্রে খবর, ছাতনা থানার কাঁকি গ্রাম লাগোয়া দ্বারকেশ্বর নদের চর থেকে গত কয়েক বছর ধরে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বালি উত্তোলন করে অবাধে পাচারের মেগা সিন্ডিকেট চালাচ্ছিল তৃণমূলের স্থানীয় নেতারা। পে-লোডার এবং ট্র্যাক্টরের সাহায্যে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকার বালি পাচার করে সরকারি কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছিল। শুধু তাই নয়, গায়ের জোরে স্থানীয় গ্রামবাসীদের জমি দখল করে মাফিয়ারা নদীর পাড়েই গড়ে তুলেছিল পাকা অফিসঘর ও বালি পরিবহণের নিজস্ব রাস্তা।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এই অবৈধ বালিঘাটের খবর পাওয়া মাত্রই ছাতনার বিজেপি বিধায়ক সত্যনারায়ণ মুখোপাধ্যায় নিজে ট্র্যাক্টর ও বুলডোজার নিয়ে সশরীরে স্পটে হাজির হন। বিধায়ক ঘাটে পৌঁছানোর পর সেখানে তড়িঘড়ি তলব করা হয়:

  • ছাতনা থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী।
  • ছাতনা ব্লকের প্রশাসনিক আধিকারিকবৃন্দ।
  • ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরের (BLRO) আধিকারিকদের।

প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের উপস্থিতিতেই বিধায়কের নির্দেশে গর্জে ওঠে বুলডোজার। মুহূর্তের মধ্যে বালি মাফিয়াদের সেই অবৈধ নজরদারি অফিসঘর ভেঙে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়।

বাজেয়াপ্ত পে-লোডার ও ল্যাপটপ, তদন্তে পুলিশ

অভিযান চালিয়ে পুলিশ ও ব্লক প্রশাসন ওই অবৈধ বালিঘাট থেকে বালি উত্তোলনে ব্যবহৃত বিপুল সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করেছে, যার তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • ৩টি অত্যাধুনিক পে-লোডার (Pay-Loader)
  • ১টি ট্র্যাক্টর ও ১টি মোটরবাইক
  • বালি পাচারের হিসাব রাখা ১টি ল্যাপটপ
  • নগদ বেশ কিছু টাকা

বুধবার দুপুরে পুনরায় ওই বালি খাদানে গিয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও পুলিশি টহল খতিয়ে দেখেন বিজেপি বিধায়ক সত্যনারায়ণ মুখোপাধ্যায়।

মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রামবাসীদের মুখ বন্ধ রাখা হয়েছিল: সত্যনারায়ণ

বালিঘাটে দাঁড়িয়ে বিদায়ী তৃণমূল সরকারকে তীব্র আক্রমণ করে বিজেপি বিধায়ক সত্যনারায়ণ মুখোপাধ্যায় বলেন:

“এক শ্রেণির দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি আধিকারিকদের মদতে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে এই অবৈধ বালিঘাট থেকে মাসের পর মাস তৃণমূলের প্রথম সারির নেতারা কোটি কোটি টাকা লুট করেছেন। সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে গেলে তাঁদের ওপর আগের সরকারের পুলিশকে দিয়ে মিথ্যা মামলা চাপিয়ে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হতো। কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন রাজ্য জুড়ে এই অবৈধ কারবার এবং মাফিয়াদের সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দেওয়ার। এই বালি চুরির সঙ্গে যুক্ত সমস্ত নেতাদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করতে হবে।”

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে যখন বিধাননগরে তোলাবাজির অভিযোগে তৃণমূল কাউন্সিলর রঞ্জন পোদ্দার গ্রেফতার হয়েছেন, অন্যদিকে ফলতার ময়দান ছেড়ে পালিয়েছেন অভিষেক-ঘনিষ্ঠ জাহাঙ্গির খান, ঠিক তখনই বাঁকুড়ায় দ্বারকেশ্বরের তীরে শুভেন্দুর বিধায়কের এই ‘বুলডোজার অ্যাকশন’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর ফলে রাজ্যের অন্যান্য জেলাগুলিতেও যে অবৈধ বালি ও কয়লা সিন্ডিকেটের দিন ফুরিয়ে এসেছে, তা বলাই বাহুল্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *