কোরবানি ইদের আগে পশুজবাইয়ের কড়া নির্দেশিকাকে চ্যালেঞ্জ, ছাড়ের আর্জি জানিয়ে হাইকোর্টে তৃণমূল

কোরবানি ইদের আগে পশুজবাইয়ের কড়া নির্দেশিকাকে চ্যালেঞ্জ, ছাড়ের আর্জি জানিয়ে হাইকোর্টে তৃণমূল

রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর যখন বিএসএফ-কে সীমান্ত জমি হস্তান্তর এবং মাদ্রাসায় ‘বন্দে মাতরম’ বাধ্যতামূলক করার মতো একের পর এক মেগা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে নতুন বিজেপি সরকার, ঠিক তখনই ধর্মীয় উৎসব ও খাদ্যাভ্যাসের অধিকারকে কেন্দ্র করে এবার আইনি লড়াই গড়াল দেশের উচ্চ আদালতে। আগামী কোরবানি বা বকরি ইদের আগে শুভেন্দু অধিকারী সরকারের জারি করা পশুজবাই সংক্রান্ত কড়া নির্দেশিকাকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টে (Calcutta High Court) দায়ের হলো একাধিক জনস্বার্থ মামলা।

রঘুনাথগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক আখরুজ্জামান এবং কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রের যৌথ নেতৃত্বে দায়ের হওয়া এই মামলায় মূলত আসন্ন উৎসবের দিনগুলিতে সরকারি কড়াকড়ি থেকে কিছু বিশেষ ছাড়ের আর্জি জানানো হয়েছে। বুধবার হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, এই সংক্রান্ত সমস্ত মামলার শুনানি বৃহস্পতিবার (২১শে মে) একসঙ্গে করা হবে।

১৪ বছরের নিয়ম ও লিখিত অনুমতি: কী বলা আছে শুভেন্দু সরকারের নির্দেশিকায়?

ছাব্বিশের মসনদ বদলের পর রাজ্য জুড়ে গো-বলয় ও সীমান্ত এলাকায় গবাদি পশু পাচার ও হত্যা রুখতে ১৯৫০ সালের পশ্চিমবঙ্গ প্রাণিসম্পদ সংরক্ষণ আইন (West Bengal Animal Preservation Act, 1950) পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে কার্যকর করেছে নতুন সরকার। গত ১৩ই মে নবান্নের জারি করা নির্দেশিকা অনুযায়ী:

  • বয়সের কড়া আইনি বেড়ি: ১৪ বছর বয়স হয়নি, এমন কোনো গবাদি পশুকে (গরু, বলদ, মোষ ইত্যাদি) জবাই বা কোরবানি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
  • প্রশাসনিক ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক: গবাদি পশু কাটার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় পুরসভা, পঞ্চায়েত কর্তৃপক্ষ কিংবা রাজ্য প্রাণিসম্পদ দফতরের সুনির্দিষ্ট লিখিত অনুমতি থাকা আবশ্যিক। প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়া পশুহত্যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

আইনের ১২ নম্বর ধারা হাতিয়ার করে মোষ ও বলদ কোরবানির আর্জি মহুয়ার

এই নির্দেশিকা জারি হওয়ার পর থেকেই রাজ্যের মুসলিম অধ্যুষিত জেলাগুলিতে এক বিরাট ‘অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা’ তৈরি হয়েছে বলে দাবি বিরোধী শিবিরের। এই ইস্যুতে ইতিমধ্যেই প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী এবং আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে স্মারকলিপি পাঠিয়েছেন।

বুধবার হাইকোর্ট চত্বরে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের হেভিওয়েট সাংসদ মহুয়া মৈত্র আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন:

“রাজ্য সরকার গবাদি পশু নিয়ে যে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে, তার প্রেক্ষিতে আমরা আইনের ১২ নম্বর ধারা (Section 12) অনুযায়ী একটি বিশেষ ছাড়ের আবেদন জানিয়েছি। মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে বকরি ইদ অত্যন্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। মূল আইনি ধারাতেই উৎসবের স্বার্থে ছাড় দেওয়ার বিশেষ সংস্থান বা অনুমতি রয়েছে। আমরা আদালতের কাছে আর্জি জানিয়েছি, আসন্ন উৎসবের দিনগুলিতে গরুকে বাদ দিয়ে অন্তত মোষ বা বলদ কোরবানির ক্ষেত্রে যেন এ বারের মতো প্রশাসনকে অনুমতি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।”

গরু বন্ধ হলে হিন্দু ব্যবসায়ীরাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন: তৃণমূল

তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র এই মামলার এক বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক তুলে ধরে দাবি করেন, সরকারের এই হঠাৎ সিদ্ধান্তে শুধু মুসলিমরাই নন, হিন্দু সমাজের একটা বড় অংশও চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন। গ্রামীণ বাংলার বহু হিন্দু কৃষক ও ব্যবসায়ী সারা বছর ধরে কোরবানির হাটে বিক্রির উদ্দেশ্যে গরু ও অন্যান্য গবাদি পশু লালন-পালন করেন। উৎসবের ঠিক মুখে এই কড়া নিষেধাজ্ঞার ফলে তাঁদের বিপুল লোকসান হবে।

অন্যদিকে, মূল আবেদনকারী তথা তৃণমূল বিধায়ক আখরুজ্জামান কোরবানির ধর্মীয় ভাবাবেগের কথা উল্লেখ করে বলেন, “কোরবানি হলো আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিজের প্রিয় ও সুস্থ-সবল পোষ্যকে উৎসর্গ করার এক পবিত্র রীতি। বহু মানুষ দীর্ঘ দিন ধরে এই উৎসবের জন্য পশু প্রতিপালন করছেন। কিন্তু ১৩ মে-র এই সরকারি ফতোয়ার ফলে গ্রাউন্ড স্তরে চরম জটিলতা তৈরি হয়েছে।”

বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের মেগা শুনানি, নজরে নবান্নের অবস্থান

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে যখন আমলাদের ফাইল ফাঁস রুখতে নবান্নের চরম ‘সেন্সর’ গাইডলাইন জারি হয়েছে আর অন্যদিকে সল্টলেকের তৃণমূল কাউন্সিলর রঞ্জন পোদ্দার তোলাবাজির দায়ে হাজতবাস করছেন, ঠিক তখনই বকরি ইদের আগে এই আইনি লড়াই শুভেন্দু সরকারের জন্য এক বড় পরীক্ষা।

বিগত সরকারের জমানায় যেভাবে এই সমস্ত আইনকে লঘু করে দেখা হতো, নতুন জমানায় যে তার সম্পূর্ণ উল্টো মেরুকরণ ঘটছে, তা এই বিজ্ঞপ্তির কড়াকড়ি থেকেই স্পষ্ট। এখন দেখার, বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ আইনের ১২ নম্বর ধারা খতিয়ে দেখে উৎসবের জন্য কোনো অন্তর্বর্তী ছাড় দেয় নাকি রাজ্য সরকারের কড়া নির্দেশিকাই বহাল রাখে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *