মোদীকে প্রশ্ন কি কেবলই ভাইরাল হওয়ার ছক? ভারতীয় সাংবাদিকের প্রশ্নে এবার ‘ক্লিন বোল্ড’ নরওয়ের হেলে লিং

মোদীকে প্রশ্ন কি কেবলই ভাইরাল হওয়ার ছক? ভারতীয় সাংবাদিকের প্রশ্নে এবার ‘ক্লিন বোল্ড’ নরওয়ের হেলে লিং

নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গার স্টোরের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় বেমক্কা এক প্রশ্ন ছুঁড়ে বিশ্বজুড়ে শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন নরওয়ের সাংবাদিক হেলে লিং। চিৎকার করে মোদীকে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের থেকে কোনো প্রশ্ন নেবেন না আপনি?’ হেলের সেই ‘ইয়র্কার’ মারার চেষ্টা অবশ্য মোদী ধ্রুপদী কায়দায় এড়িয়ে যান। কিন্তু এই ঘটনার পরদিন, অর্থাৎ বুধবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম NDTV-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই হেলে লিং নিজেই যেভাবে ‘ক্লিন বোল্ড’ হলেন, তা এখন নেটদুনিয়ায় চর্চার মূল কেন্দ্রবিন্দু।

এনডিটিভি-র সাংবাদিকের একের পর এক গুড লেংথ ডেলিভারির সামনে নরওয়ের এই ভাইরাল সাংবাদিকের মিডল স্টাম্প কার্যত উড়ে গেল। তাঁর চোখে-মুখে অস্বস্তি এবং আমতা-আমতা ভাব বুঝিয়ে দিল, মোদীকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করার চেষ্টা করলেও নিজে প্রশ্নবাণের মুখে কতটা দুর্বল তিনি।

নাটক নাকি সস্তার পাবলিসিটি? এনডিটিভি-র প্রশ্নে থমকালেন হেলে

হেলে লিং নিজের সোশাল মিডিয়া পোস্টে লিখেছিলেন, ‘মোদী উত্তর দেবেন, আমি আশাও করিনি।’ সাক্ষাৎকারের শুরুতেই এই পোস্টকে হাতিয়ার করে এনডিটিভি-র সাংবাদিক তাঁকে চেপে ধরেন— তবে কি পুরো বিষয়টিই ছিল স্রেফ ভাইরাল হওয়া এবং নাটক করার ছক?

জবাবে নিজের সাংবাদিক পরিচয়কে ঢাল বানিয়ে হেলে বলেন, “প্রশ্ন করাই আমার কাজ। মোদীর সামনে প্রশ্ন রাখাটা জরুরি মনে হয়েছিল।” তবে সেটি যে কোনো উন্মুক্ত সাংবাদিক বৈঠক ছিল না, বরং একটি পূর্বনির্ধারিত প্রোটোকল মেনে চলা যৌথ প্রেস ব্রিফিং (Joint Press Briefing)— তা মনে করিয়ে দিতেই হেলের যুক্তি দাঁড়ায় অত্যন্ত দুর্বল। তিনি সাফাই দেন, “ভবিষ্যতে আবার কবে মোদীর সামনে প্রশ্ন করার সুযোগ আসবে বা আদৌ আসবে কি না জানি না, তাই সুযোগ হাতছাড়া করিনি।” অথচ অদ্ভুত বিষয় হলো, প্রেস ব্রিফিংয়ের এই ফরম্যাট নিয়ে তিনি নিজের দেশের বিদেশ মন্ত্রকের কাছে আগে কোনো লিখিত আপত্তি জানাননি, যা তিনি নিজেই এই সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন।

ভারত সম্পর্কে জ্ঞান কেবল ‘যোগব্যায়াম আর খাবার’!

বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এবং ভারতের মতো বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার আগে ভারত সম্পর্কে হেলের পড়াশোনা কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। জবাবে তিনি দাবি করেন, ভারত সম্পর্কে তিনি অনেক কিছু জানেন। কিন্তু উদাহরণ দিতে গিয়ে যোগব্যায়াম এবং ভারতীয় খাবার ছাড়া আর এক পা-ও এগোতে পারেননি তিনি।

শেষে কার্যত আত্মসমর্পণ করে হেলে স্বীকার করে নেন:

“আমি কোনোদিন ভারতে যাইনি। আপনাদের দেশ নিয়ে আমার বিশেষ পড়াশোনাও নেই। প্রেস ফ্রিডম নিয়ে যে গাইডলাইন ও রিপোর্ট দেখেছি, তার ভিত্তিতেই ওই কথা বলেছিলাম।”

সূচক বিতর্ক ও নরওয়েজিয়ান পত্রিকার বর্ণবিদ্বেষ নিয়ে মুখে কুলুপ

ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইন্ডেক্সে (Press Freedom Index) নরওয়ে যেখানে এক নম্বরে, ভারত সেখানে ১৫৭-তম স্থানে। কিন্তু এই সূচক তৈরির পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মহলে বড়সড় সংশয় রয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতের চেয়ে কাতারের মতো রাজতন্ত্র কীভাবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় এগিয়ে থাকে— এই অকাট্য যুক্তির সামনে কোনো স্পষ্ট জবাব দিতে পারেননি হেলে। তিনি কেবল এটুকুই বলেন, “কয়েকটি দেশের অবস্থান নিয়ে হয়তো নতুন করে ভাবা উচিত।”

সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় নরওয়ের ‘আফতেনপোস্তেন’ পত্রিকায় প্রধানমন্ত্রী মোদীকে ‘সাপুড়ে’ হিসেবে ব্যঙ্গচিত্র (Caricature) প্রকাশ করা নিয়ে। প্রথম বিশ্বের একটি নামী সংবাদমাধ্যমের এমন স্পষ্ট বর্ণবিদ্বেষী (Racist) আচরণের তীব্র নিন্দা করতে গিয়ে গলা কাঁপল প্রেস ফ্রিডমের স্বঘোষিত চ্যাম্পিয়নের। বিষয়টি পুরোপুরি এড়িয়ে গিয়ে হেলে লিং মুখে কুলুপ এঁটে বলেন, “পুরোপুরি না জেনে এই বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না।”

রাহুল গান্ধীর সাক্ষাৎকার নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ

গোটা বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ভারত তথা আন্তর্জাতিক মহলে এত বড় চর্চা শুরু হবে, তা হেলে নিজেও কল্পনা করতে পারেননি। তবে এই লাইমলাইটের মাঝেই তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন যে সুযোগ পেলে তিনি লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর সাক্ষাৎকার নিতে চান। এমনকি তাঁর ভাইরাল হওয়া সোশাল মিডিয়া পোস্টে রাহুল গান্ধী স্বয়ং প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বলেও দাবি করেছেন এই নরওয়েজিয়ান সাংবাদিক। তবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে মোদীকে নাস্তানাবুদ করার চেষ্টা করলেও, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের পেশাদার প্রশ্নের ডালির সামনে যে হেলে লিং নিজেই পুরোপুরি ‘ক্লিন বোল্ড’ হয়ে মাঠ ছাড়লেন, তা বলাই বাহুল্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *