‘লোকের সামনে আমাকে লজ্জা দিস না’ ছোটবেলায় বলা এই ৫টি কথা বড় হয়ে বাড়াতে পারে মারাত্মক অ্যাংজ়াইটি

ছেলেবেলায় বাবা-মায়ের কাছে বকুনি বা শাসন খায়নি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। কখনও পড়াশোনা না করার জন্য বকুনি, আবার কখনও দুষ্টুমির জন্য হালকা কিল-চড়— কম-বেশি সব পরিবারেই এটি খুব চেনা ছবি। তবে অনেক সময় রাগের মাথায় বা সন্তানকে শান্ত করতে বাবা-মা ও পরিবারের বড়রা এমন কিছু কথা বলে ফেলেন, যা সেই মুহূর্তে খুব সাধারণ মনে হলেও শিশুর মনে আজীবন গভীর ক্ষত তৈরি করে।
মেলায় গিয়ে বা দোকানে কোনো খেলনা কেনার জন্য শিশু বায়না করলেই অনেক সময় বাবা-মা বলে ওঠেন—‘লোকের সামনে আমাকে লজ্জা দিস না’ কিংবা ‘এত নাটক করিস না’। মনোবিদদের মতে, ছোটবেলায় বার বার শোনা এই কথাগুলি যত দিন এগোয়, ততই শিশুর মস্তিষ্কে ও চিন্তাভাবনায় গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিশুরা কেবল এই কথাগুলি শোনে না, এর থেকে তীব্র অপমানবোধেও ভোগে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই অভিজ্ঞতাগুলিই তাদের ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে দাঁড়ায়, যার ফলে বড় হয়ে তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব, অতিরিক্ত ভয়, ওভারথিঙ্কিং (Overthinking), মানুষকে খুশি রাখার অন্ধ প্রবণতা (People Pleasing) কিংবা সোশ্যাল অ্যাংজ়াইটির (Social Anxiety) মতো জটিল মানসিক সমস্যা দেখা দেয়।
সন্তানকে শাসন করার সময় বাবা-মায়েদের শব্দচয়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সচেতন থাকা জরুরি। জেনে নিন এমন ৫টি কথা, যা সন্তানের সামনে ভুলেও কখনো বলা উচিত নয়:
১. ‘তুমি বড্ড বেশি সেনসিটিভ বা আবেগপ্রবণ’
এই একটি কথা শিশুকে অবচেতনেই শিখিয়ে দেয় যে, তার নিজের আবেগের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই অথবা তার অনুভূতিগুলি সম্পূর্ণ ভুল ও অর্থহীন। যখন কোনো শিশু তার কষ্টের কথা বলতে গিয়ে বাবা-মায়ের কাছ থেকে এই ধরণের প্রতিক্রিয়া শোনে, সে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। বড় হয়ে এরা নিজের প্রতিটা স্বাভাবিক ইমোশন নিয়ে লজ্জিত থাকে এবং সারাক্ষণ অন্যের কাছে অপরাধী বোধ করে ও ক্ষমা চাইতে থাকে।
২. ‘কান্না থামাও, নয়তো মার খেয়ে আরও কাঁদবে’
কান্না থামানোর এই হিংস্র বা ভয় দেখানোর পদ্ধতি শিশুকে শেখায় যে দুঃখ, কষ্ট বা ভয় প্রকাশ করা একেবারেই নিরাপদ নয়। ফলে সে নিজের আবেগ মনের গভীরে চেপে রাখতে শেখে। মনোবিদদের মতে, এই চাপা আবেগই একসময় বড় হয়ে তীব্র উদ্বেগ, রাগ বা মানসিক ক্লান্তির জন্ম দেয়। এমন বহু মানুষ আছেন যারা বড় হয়েও নিজের কষ্টের কথা কাউকে বলতে পারেন না, কারণ ছোটবেলা থেকেই তাঁদের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে ‘কাঁদা হলো দুর্বলতার লক্ষণ’।
৩. ‘ওর মতো হতে পারো না কেন?’
অন্যের বা প্রতিবেশীর ছেলেমেয়ের সাথে তুলনা করাটা অনেক বাবা-মায়ের কাছে ‘মোটিভেশন’ বা অনুপ্রেরণা দেওয়ার কৌশল মনে হতে পারে। কিন্তু শিশুর মনস্তত্ত্বে এর প্রভাব সম্পূর্ণ উল্টো হয়। সে ভাবতে শুরু করে—‘আমি হয়তো একেবারেই ভালো নই, বাবা-মা আমাকে ভালোবাসে না।’ এর ফলে বড় হয়েও তাদের মধ্যে সবসময় অন্যের সাথে নিজেকে তুলনা করার এক মারাত্মক রোগ তৈরি হয় এবং তারা নিজের কোনো সাফল্যেও কখনো মন থেকে খুশি হতে পারে না।
৪. ‘আমার মান-সম্মান ডুবিয়ে দিও না’
এই কথাটি শিশুর মনে এই ধারণা তৈরি করে যে, তার নিজের ভালো-মন্দের চেয়েও বাইরের মানুষের মতামত বা সমাজের কাছে পরিবারের কৃত্রিম ছবি ধরে রাখাটা বেশি জরুরি। এর ফলে শিশুর মধ্যে তীব্র সোশ্যাল অ্যাংজ়াইটি বা সামাজিক ভীতি তৈরি হয়। বড় হয়ে তারা জনসমক্ষে কথা বলতে, মঞ্চে উঠতে বা নিজের স্পষ্ট মতামত দিতে ভয় পায় এবং ক্রমাগত অবসেসিভলি ভাবতে থাকে—‘কে কী মনে করল!’
৫. ‘আমি তোমার জন্য কত কী করেছি বা ত্যাগ করেছি’
নিজের ত্যাগ বা উপকারের কথা সন্তানের সামনে বারবার মনে করিয়ে দিলে শিশুর মনে এক ধরণের গভীর অপরাধবোধ (Guilt) তৈরি হয়। সে নিজেকে পরিবারের ওপর একটি বাড়তি ‘বোঝা’ মনে করতে শুরু করে। বড় হয়ে এই শিশুরা স্বাধীনভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না এবং নিজেদের অধিকারের কথা ভুলে সারাক্ষণ চারপাশের মানুষকে খুশি করার এক মানসিক চক্রে ফেঁসে যায়।
মনোবিদদের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীর কোনো পরিবারই একশো ভাগ নিখুঁত বা পারফেক্ট নয়। রাগ, ক্ষোভ ও ভুল বোঝাবুঝি সব সম্পর্ক ও সংসারেই থাকে। কিন্তু সন্তানকে মানসিকভাবে নিরাপদ (Mentally Safe) অনুভব করানোটা সবথেকে বড় দায়িত্ব। শাসন করার সময় যদি রাগের মাথায় কোনো ভুল কথা মুখ থেকে বেরিয়েও যায়, তবে পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হলে সন্তানের কাছে ক্ষমা চাওয়া বা নিজের ভুল স্বীকার করা অত্যন্ত জরুরি। সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন এবং তাকে বোঝান যে, তার রাগ, দুঃখ বা কান্নাও সমান গুরুত্বপূর্ণ ও স্বাভাবিক।