‘আগে আমরা ভারতীয়, পরে বাঙালি’, মেধাবী কৃতীদের সংবর্ধনায় ‘ব্রেন ড্রেন’ রুখতে শমীক-শুভেন্দুর মেগা রোডম্যাপ

রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর শিক্ষা পরিকাঠামো সংস্কার এবং মেধা ধরে রাখার প্রশ্নে এক বিরাট ও দূরদর্শী পদক্ষেপ নিল নতুন বিজেপি সরকার। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, মাদ্রাসা, সিবিএসই (CBSE) এবং আইসিএসই (ICSE) বোর্ডের দুর্দান্ত ফল করা কৃতি ছাত্র-ছাত্রীদের সংবর্ধনা দিতে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কৃতিদের এটাই প্রথম সরকারি সংবর্ধনা অনুষ্ঠান, যেখানে নবান্নের ক্যাবিনেট বৈঠক সেরেই সরাসরি হাজির হন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে রাজ্য বিজেপির সভাপতি তথা রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী উভয়েই রাজনীতিমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বাংলার মেধা বাংলায় ধরে রাখার এক মাস্টারপ্ল্যান ও ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ তুলে ধরেন।
বিশ্বমঞ্চে ভারতের ঐতিহ্য ও বহুত্ববাদের পাঠ শমীকের গলায়
সংবর্ধনা মঞ্চে দাঁড়িয়ে যুবসমাজের উদ্দেশ্যে এক অত্যন্ত উচ্চমানের ও তাত্ত্বিক ভাষণ দেন সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য। বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শনে প্রাচীন ভারতের অবিস্মরণীয় অবদানের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন:
“আমরা এমন এক পুণ্যভূমিতে জন্মগ্রহণ করেছি, যা গোটা বিশ্বকে শিক্ষার আলো দেখিয়েছে। আজ আমরা যে ব্যাকরণ চর্চা করছি, ত্রিকোণমিতি, জ্যামিতি, সংখ্যাতত্ত্ব থেকে শুরু করে জ্যোতির্বিজ্ঞান কিংবা আধুনিক বিজ্ঞানের রিডাকশন গিয়ারের কনসেপ্ট— তার সবকিছুর উৎস কিন্তু এই ভারতবর্ষ। রাজনৈতিক দল বা সরকার আসবে-যাবে, কিন্তু ভারতের মাটির মূল তত্ত্ব হলো ‘একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি’— অর্থাৎ সত্য এক, জ্ঞানীরা তাকে বহু নামে ডাকেন। এই বহুত্ববাদ ও একতার শিক্ষাই আমাদের মূল শক্তি।”
‘ব্রেন ড্রেন’ রুখতে ইনক্লুসিভ বাঙালিয়ানা ও কৃতিদের বিশেষ ‘টাস্ক’
বিগত কয়েক দশকে উচ্চশিক্ষা ও চাকরির খোঁজে বাংলার মেধার ভিন রাজ্যে পাড়ি দেওয়া বা ‘ব্রেন ড্রেন’ (Brain Drain) নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন শমীক ভট্টাচার্য। কৃতিদের উদ্দেশ্যে তাঁর স্পষ্ট বার্তা, “আপনারা প্রত্যেকে নিজস্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ুন। কিন্তু মনের মধ্যে সবসময় একটা কথা গেঁথে রাখবেন— আমরা যারা পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা, আমরা প্রথমে ভারতীয়, তারপরে আমরা একজন বাঙালি।”
এই বাঙালিয়ানার সংজ্ঞাকে আরও চওড়া করে এক বড় অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive) বার্তা দেন তিনি। তাঁর মতে, বাংলায় বাস করে শুধু বাংলা ভাষায় কথা বললেই বাঙালি হওয়া যায় না। যাঁরা বাড়িতে হিন্দি, ওড়িয়া বা রাজস্থানি ভাষায় কথা বলেন, কিন্তু কয়েক পুরুষ ধরে বাংলার মাটির আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য কাজ করছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই বাঙালি।
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অনাবাসী বাঙালিদের বাংলায় ফিরিয়ে আনতে কৃতিদের একটি বিশেষ ‘টাস্ক’ বা দায়িত্ব দেন শমীক। তিনি বলেন, “আপনাদের যে সমস্ত আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুরা ভিন রাজ্যে বা দেশের বাইরে আছেন, তাঁদের ফোন করে বলুন যে পশ্চিমবঙ্গে এখন নতুন পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তাঁদের আবেদন জানান— পশ্চিমবঙ্গে আসুন, বড় শিল্প গড়ুন, ইউনিভার্সিটি ও মেডিক্যাল কলেজ তৈরি করুন। আমাদের রাজ্যের মেধার বিকাশ ঘটান।”
ধর্মীয় ভাতা বন্ধ করে ‘বিবেকানন্দ মেরিট স্কলারশিপ’, মেগা ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
সাংসদ শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্যকে কুর্নিশ জানিয়ে নিজের ভাষণ শুরু করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কৃতিদের স্বামী বিবেকানন্দ ও বিদ্যাসাগরের আদর্শে চলার পরামর্শ দিয়ে এবং প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ড. এপিজে আব্দুল কালামের অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা শোনার আহ্বান জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী এক মস্ত বড় নীতিগত ও আর্থিক ঘোষণা করেন।
শিক্ষায় তোষণ নীতি ও রাজনীতি বন্ধ করার অঙ্গীকার করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানান:
- ভাতা বন্ধ, স্কলারশিপে জোর: বিগত তৃণমূল সরকারের জমানার সমস্ত ধরণের ধর্মীয় ভাতা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
- বিবেকানন্দ মেরিট স্কলারশিপ: ধর্মীয় ভাতা বাবদ সাশ্রয় হওয়া সমস্ত অর্থ এবার থেকে সরাসরি যুক্ত করা হবে ‘বিবেকানন্দ মেরিট স্কলারশিপ যোজনা’ (Vivekananda Merit Scholarship Scheme)-তে।
- বর্ণ-ধর্মহীন সাহায্য: এই স্কলারশিপের মাধ্যমে রাজ্যের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের বর্ণ, ধর্ম, জাতি বা রাজনৈতিক দল-মত নির্বিশেষে সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এই সুবিধার জন্য অভিভাবকদের সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর দফতর (CMO) বা শিক্ষা দফতরে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
কৃতিদের উপহারে ল্যাপটপ ও স্বামীজির বই
বাংলার মেধার প্রশংসা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমাদের রাজ্যের ছেলেমেয়েরা ইউরোপের বড় বড় ইউনিভার্সিটিগুলোতে গিয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমাদের সরকারের মূল লক্ষ্য— এই মেধা যেন আমাদের রাজ্যেই থাকে। সেই মেধাকে কাজে লাগিয়েই আমরা আগামী দিনে কবিগুরুর ভাবনার বাংলা এবং স্বামী বিবেকানন্দের স্বপ্নের প্রকৃত ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলব।”
এ দিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত সমস্ত কৃতি ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে সরকারি সংবর্ধনা হিসেবে তুলে দেওয়া হয় অত্যাধুনিক ল্যাপটপ। এর পাশাপাশি স্বামী বিবেকানন্দের ছবি, স্বামীজির লেখা বিখ্যাত ‘আমার ভারত, অমর ভারত’ বই এবং ফুল ও মিষ্টি দিয়ে তাঁদের মিষ্টি মুখ করানো হয়।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে যখন মাদ্রাসায় ‘বন্দে মাতরম’ বাধ্যতামূলক করা এবং আমলাদের ফাইল ফাঁস রুখতে নবান্নে কড়া ‘সেন্সর’ গাইডলাইন জারি করে শুভেন্দু সরকার নিজেদের প্রশাসনিক রাশ শক্ত করছে, ঠিক তখনই সমস্ত ধর্মীয় ভাতা বন্ধ করে ‘বিবেকানন্দ স্কলারশিপ’ চালুর এই মেগা সিদ্ধান্ত রাজ্য রাজনীতিতে এক অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী মাস্টারস্ট্রোক। এর মাধ্যমে নতুন সরকার স্পষ্ট করে দিল যে, বাংলায় তোষণের দিন শেষ হয়ে এবার সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতেই শিক্ষাক্ষেত্র পরিচালিত হতে চলেছে।