গঙ্গাজলে শুদ্ধিকরণ করে টলিউডে অরূপ-স্বরূপের জমানা শেষের ডাক দিলেন বিধায়ক পাপিয়া

ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে ক্ষমতা দখল করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বড়সড় প্রভাব এবার পড়তে শুরু করেছে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প তথা টলিউডেও। টালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে হেভিওয়েট তৃণমূল প্রার্থী অরূপ বিশ্বাসকে বিপুল ব্যবধানে হারিয়ে বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন অভিনেত্রী পাপিয়া অধিকারী। জয়ের পরদিনই জাদুকর পিসি সরকারের দুই কন্যা মুমতাজ ও মানেকাকে সঙ্গে নিয়ে টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োর ফেডারেশন অফিসে হাজির হন নবনির্বাচিত বিধায়ক। সেখানে বোতল থেকে গঙ্গাজল ছিটিয়ে পুরো অফিস চত্বর ধুয়ে এক অভিনব শুদ্ধিকরণ অভিযানের মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক ইনিংস শুরু করলেন তিনি।
পরাস্ত ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’ এবং টলিউডের নতুন হাওয়া
বিগত কয়েক বছর ধরে টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে অরূপ বিশ্বাস ও স্বরূপ বিশ্বাসের একচ্ছত্র আধিপত্য ও দাপট ছিল প্রশ্নাতীত। শুটিং বন্ধ করে দেওয়া, পরিচালক ও প্রযোজকদের কাজে বাধা সৃষ্টি করা, ‘ব্যান কালচার’ বা নিষেধাজ্ঞা জারি এবং সিনেমার মুক্তি আটকে দেওয়ার মতো একাধিক অভিযোগ উঠেছিল এই ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’-এর বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক এই নাগপাশ থেকে টলিউডকে মুক্ত করার দাবি সিনেমা পাড়ায় দীর্ঘদিনের। ফেডারেশন অফিসে এসে পাপিয়া অধিকারী স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, টলিউডে অরূপ-স্বরূপের দাদাগিরির দিন এবার শেষ। দীর্ঘদিন ধরে ভয়ের পরিবেশে থাকা কলাকুশলীদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, এবার সবাই খোলা হাওয়ায় শ্বাস নিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন।
মহিলা সুরক্ষা ও কাজের নতুন নিয়মাবলী
টালিগঞ্জের মসনদে বসেই চলচ্চিত্র শিল্পের সামগ্রিক পরিবেশ ও নিয়মনীতিতে বড়সড় বদল আনার ইঙ্গিত দিয়েছেন বিজেপি বিধায়ক। টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় ভেন্ডার গিল্ডের সম্পাদক সৈকত দাস-সহ বিভিন্ন গিল্ডের সদস্যদের উপস্থিতিতে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি একাধিক নতুন নিয়ম জারির কথা জানান। বিশেষ করে নারী নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়ে তিনি নির্দেশ দেন যে, রাতে শুটিং শেষ হলে মহিলা কর্মীদের যথাযথ সুরক্ষায় বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে কর্তৃপক্ষকে। পাশাপাশি, শুটিংয়ের আগের দিন মাঝরাতে ‘কল টাইম’ দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করে অন্তত তিন দিন আগে শিল্পীদের সময় জানানোর নিয়ম চালু করার কথা বলেন। কোনো প্রযোজক বা পরিচালক যাতে অন্যায্য নিষেধাজ্ঞার শিকার না হন, অর্থাৎ ক্ষতিকর ‘ব্যান সংস্কৃতি’ যাতে পুরোপুরি বন্ধ হয়, তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
রাহুল মৃত্যুর তদন্ত ও ভবিষ্যতের রূপরেখা
টলিউডের গৌরব পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি অভিনেতা রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাটি নিয়েও সুর চড়িয়েছেন নতুন বিধায়ক। তিনি অভিযোগ করেন, এই মৃত্যুর ঘটনার কোনো সঠিক অনুসন্ধান বা তদন্ত হয়নি। প্রশাসন ও প্রযোজকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি এই মামলাটি পুনরায় চালুর (কেস ওপেন) হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত স্তরের শিল্পী ও কলাকুশলীদের কাজের পরিধি বাড়ানো এবং তাঁদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই নতুন সরকারের মূল লক্ষ্য বলে জানান তিনি। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, এই পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘদিনের একাধিপত্যের অবসান ঘটে টলিউডে একটি মুক্ত ও পেশাদার কর্মপরিবেশ তৈরি হতে পারে, যা বাংলা সিনেমার হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।