ফলতা থেকেই কি বদলের কাউন্টডাউন? বিজেপির ২০৮ মিশনের মাঝেই চাঞ্চল্যকর ইঙ্গিত
ক্ষমতা হারানোর মাত্র ১৫ দিনের মধ্যেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল তৃণমূলের একদা অপরাজেয় ‘দুর্গ’। দলটির অন্দরের অনেকেই রবীন্দ্রকাব্যের উপমা টেনে যাকে ইতিমধ্যেই ‘নকল বুঁদির গড়’ বলে চিহ্নিত করতে শুরু করেছেন, সেই ফলতায় এখন গেরুয়া শিবিরের জয় স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। ফলতা বিধানসভা পুনর্নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী জাহাঙ্গির খান আকস্মিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা করায় রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে নির্বাচন কমিশনের নথিতে বিজেপির আসন সংখ্যা ২০৮-এ নিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ চলে এল পদ্ম শিবিরের হাতে।
ধূলিসাৎ বহুল চর্চিত ডায়মন্ড হারবার মডেল
গত ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর থেকেই ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত এলাকাগুলোতে তৃণমূলের সংগঠনে ভয়াবহ ধস নামতে শুরু করেছে। দলটির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৈরি এই ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’ নিয়ে বিগত দিনে রাজ্য রাজনীতিতে চর্চার শেষ ছিল না। এই মডেলের জোরেই ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে একের পর এক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছিল জোড়াফুল শিবির। এমনকি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও এই অঞ্চল থেকে রেকর্ড ভোটে জয়ী হয়েছিলেন অভিষেক। কিন্তু ক্ষমতা বদলের মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে তাঁরই ‘ঘনিষ্ঠ অনুগামী’ জাহাঙ্গির খানের এই আত্মসমর্পণ সেই মডেলের কার্যকারিতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল।
আনুষ্ঠানিকভাবে জাহাঙ্গির খান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ঘোষিত বিশেষ প্যাকেজের দোহাই দিয়ে উন্নয়নের স্বার্থে মাঠ ছাড়ার কথা বললেও, আসল কারণ ভিন্ন বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। একদিকে পুনর্নির্বাচনে বিজেপির সর্বাত্মক ঝাঁপিয়ে পড়া, অন্যদিকে কঠিন পরিস্থিতিতে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি ও রাজ্যজুড়ে চলা পুলিশি ধরপাকড় তৃণমূল শিবিরের মনোবল ভেঙে দিয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রার্থী জাহাঙ্গির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন বলে জানা গেছে।
অভিষেকের দুর্গে একের পর এক ধাক্কা
ফলতার এই নাটকীয় পটপরিবর্তন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ডায়মন্ড হারবার জুড়ে তৃণমূলের একের পর এক বিপর্যয়েরই ধারাবাহিকতা। গত ৪ মে ভোটের ফলাফলেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে অভিষেকের দুর্গে থাবা বসিয়েছে বিজেপি, যার প্রমাণ মেলে ডায়মন্ড হারবার লোকসভার অন্তর্গত সাতগাছিয়া বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের পরাজয়ে। এছাড়া, বিষ্ণুপুরের তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল বর্তমানে পুলিশি মামলার ভয়ে পলাতক এবং তাঁর পুত্রকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি, ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল বিধায়ক পান্নালাল হালদারের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ফুলের তোড়া নিয়ে স্বাগত জানাতে যাওয়ার ঘটনাও ক্ষমতার সমীকরণ বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডায়মন্ড হারবারে গত এক দশকে যে রাজনৈতিক সৌধ গড়ে উঠেছিল, তা মূলত দাঁড়িয়ে ছিল সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন সমর্থনের ওপর। ফলে রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তন হতেই তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ছে সেই সাজানো দুর্গ। ফলতায় এই ওয়াকওভারের জেরে কার্যক্ষেত্রে এবং আইনি বিধিসম্মত নথিতে বিজেপির আসন সংখ্যা আরও শক্তিশালী হতে চলেছে, যা রাজ্য রাজনীতিতে তৃণমূলের অস্তিত্বকে আরও বেশি সংকটে ফেলবে।