বিয়ের ওড়নায় নতুন ট্রেন্ড, ফুল-লতাপাতা বদলে জায়গা করে নিচ্ছে মনের কথা!

বিয়ের সাজে লাল বেনারসি আর ভারী গয়নার চিরন্তন আভিজাত্যের পাশাপাশি এখন যুক্ত হয়েছে এক নতুন মাত্রা। আধুনিক কনেদের কাছে বিয়ের সাজ মানে কেবল ঐতিহ্য নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক টুকরো অনুভূতিও। আর এই অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটছে কনের মাথার ওড়নায়। এক সময় বিয়ের ওড়না মানেই ছিল চওড়া নকশাপাড়, চুমকির বুটি কিংবা ফুল-লতাপাতার কারুকাজ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই চেনা ট্রেন্ডে এসেছে এক বড় বদল। নকশার পরিবর্তে ওড়নার পাড়ে বা জমিনে সুতো ও জরির হরফে ফুটে উঠছে বিয়ের মন্ত্র, প্রিয় কবিতার লাইন, বিশেষ কোনো তারিখ কিংবা বর-কনের নাম। বিয়ের ওড়নাকে এভাবে ব্যক্তিগত স্মৃতির ক্যানভাস বানিয়ে তোলার এই নতুন ফ্যাশন এখন মফস্বল থেকে মহানগর— সর্বত্র তুমুল জনপ্রিয়।
বলিউড থেকে সাধারণের ঘরে ফ্যাশনের বিবর্তন
এই ব্যক্তিগত ছোঁয়াবিশিষ্ট ওড়নার চল প্রথম শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে বলিউড অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকোনের বিয়ের হাত ধরে, যার ওড়নার পাড়ে বোনা ছিল সংস্কৃত শ্লোক ‘সদা সৌভাগ্যবতী ভব’। পরবর্তী সময়ে অভিনেত্রী পত্রলেখার ওড়নায় বাংলা বচন কিংবা পরিণীতি চোপড়ার ওড়নায় স্বামী রাঘবের নাম এই ধারাকে আরও বেগবান করে। শুরুতে এটি তারকাদের একচ্ছত্র ফ্যাশন মনে হলেও বর্তমান সময়ে এসে তা সাধারণ হবু কনেদের নাগালের মধ্যে চলে এসেছে। কলকাতার গড়িয়াহাট বা কলেজ স্ট্রিটের ঐতিহ্যবাহী কাপড়ের দোকান থেকে শুরু করে প্রথম সারির বুটিক স্টোর— সর্বত্রই এখন এই ‘পার্সোনালাইজড’ ওড়নার বিপুল চাহিদা। সাধারণ ক্রেতাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে ব্যবসায়ীরা যেমন আড়াই হাজার টাকার মধ্যে মন্ত্র লেখা ওড়না রাখছেন, তেমনই বিশেষ অর্ডারে কারিগর দিয়ে তৈরি করে দিচ্ছেন বর-কনের নাম লেখা ওড়নাও।
স্মৃতি ধরে রাখার আকুলতা ও এর কারণ
বিয়ের ওড়নায় এই পরিবর্তনের মূল কারণ হিসেবে ফ্যাশন ডিজাইনাররা মনে করছেন নিজের জীবনের গল্পকে চিরস্থায়ী করার এক প্রচ্ছন্ন ইচ্ছা। পোশাকশিল্পীদের মতে, বিয়ের সাজে ব্লাউজের পিঠের নকশার চেয়ে ওড়নার অংশটি অনেক বেশি দৃশ্যমান থাকে। তাই কনেরা তাঁদের প্রেমের গল্প, কোনো বিশেষ গানের লাইন, এমনকি আদরের পোষ্যের নামও ওড়নায় ফুটিয়ে তুলতে চাইছেন, যাতে বহু বছর পরেও ওড়নাটি দেখলেই বিয়ের সেই সুখস্মৃতি মনে পড়ে যায়। অনেক কনে আবার বিয়ের পর এই ওড়না ফ্রেমে বাঁধিয়ে ঘরের দেয়ালে সাজিয়ে রাখছেন। ঐতিহ্যবাহী শান্তিপুরী বা তাঁতের জমিতে রবীন্দ্রনাথের কবিতা কিংবা হিন্দি শায়েরি লেখার চাহিদাও এই কারণে দিন দিন বাড়ছে।
ফ্যাশনের এই পরিবর্তনের ফলে একদিকে যেমন ট্র্যাডিশনাল কারিগরদের কাজের পরিধি ও সৃজনশীলতা বাড়ছে, অন্যদিকে ৭০০-৮০০ টাকা থেকে শুরু করে লাখ টাকার অভিজাত বুটিক— সব শ্রেণির বাজেটের কনেরাই নিজেদের মতো করে বিয়ের সাজে ব্যক্তিগত ছোঁয়া রাখার সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে রূপকথার মতো বিয়ের আসরে ওড়নার জমিনে জীবনবোধ ও ভালোবাসার গল্প বুনে নেওয়ার এই ট্রেন্ড আগামী দিনে আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।