ডিজিটাল স্ক্রিনের নেশায় অন্ধত্বের ঝুঁকিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, ২০৫০ সালের মধ্যে অর্ধেক বিশ্ববাসী পড়তে পারেন ক্ষীণদৃষ্টির মুখে!

ডিজিটাল স্ক্রিনের নেশায় অন্ধত্বের ঝুঁকিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, ২০৫০ সালের মধ্যে অর্ধেক বিশ্ববাসী পড়তে পারেন ক্ষীণদৃষ্টির মুখে!

বর্তমান ডিজিটাল যুগে শৈশব বন্দি হয়ে পড়েছে মোবাইল, ল্যাপটপ কিংবা ট্যাবের চারকোণা স্ক্রিনে। আর এই পরিবর্তিত জীবনযাত্রার মারাত্মক মাশুল গুনছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। ভারতে তথা বিশ্বজুড়ে শিশুদের মধ্যে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ‘চাইল্ডহুড মাইওপিয়া’ বা ক্ষীণদৃষ্টির সমস্যা, যেখানে কাছের জিনিস স্পষ্ট দেখা গেলেও দূরের জিনিস ঝাপসা হয়ে যায়। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা স্পষ্ট করে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা এই চোখের সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন। এই পাবলিক হেলথ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ‘ওয়ার্ল্ড মায়োপিয়া উইক ২০২৬’ উপলক্ষে জরুরি নির্দেশিকা জারি করেছে ‘অল ইন্ডিয়া অফথালমোলজিক্যাল সোসাইটি’ (AIOS)।

আক্রান্তের সংখ্যায় উদ্বেগজনক গ্রাফ

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের স্কুলপড়ুয়াদের মধ্যে মাইওপিয়ার প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। শহরাঞ্চলের প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু এই রোগে আক্রান্ত। পিছিয়ে নেই গ্রামীণ এলাকাও, যেখানে গত এক দশকে এই হার ৪.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬.৮ শতাংশে পৌঁছেছে। সম্প্রতি দেশের ১২টি রাজ্যের ১৩টি শহরে ১ লক্ষেরও বেশি শিশুর ওপর পরিচালিত এক স্ক্রিনিংয়ে দেখা গেছে, প্রায় ১৩.৬ শতাংশ শিশু মাইওপিয়ায় ভুগছে এবং ২৭ শতাংশ শিশুর দৃষ্টিশক্তি অস্বাভাবিক।

লুকিয়ে আছে স্থায়ী অন্ধত্বের বড় ঝুঁকি

দিল্লির AIIMS-এর আরপি সেন্টারের প্রাক্তন প্রধান ডাঃ জীবন সিং তিতিয়াল সতর্ক করে জানিয়েছেন, চাইল্ডহুড মাইওপিয়া এখন আর শুধু অল্প বয়সে চশমা পরার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ‘হাই মায়োপিয়া’ বা চোখের অতিরিক্ত পাওয়ার ভেতরের গঠনকে স্থায়ীভাবে বদলে দেয়। এর ফলে পরবর্তী জীবনে রেটিনাল ডিটাচমেন্ট (রেটিনা ছিঁড়ে যাওয়া), গ্লুকোমা, ছানি এবং চিরকালের জন্য দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

লাইফস্টাইলের পরিবর্তন ও সমাধানের পথ

বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিনের সামনে কাটানো, অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ এবং মাঠে গিয়ে খেলাধুলো বা আউটডোর অ্যাক্টিভিটি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়াই এই রোগের মূল কারণ। অনেক শিশু নিজে এই সমস্যা বুঝতে পারে না বলে অভিভাবকদের বাড়তি নজর রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

AIIMS-এর অধ্যাপক ডঃ নম্রতা শর্মা জানান, লাইফস্টাইল পরিবর্তন ও প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এই রোগ নিয়ন্ত্রণের প্রধান হাতিয়ার। চিকিৎসকদের নির্দেশিকায় প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টা খোলা আকাশের নিচে বা রোদে খেলাধুলো করা, প্রতি বছর নিয়ম করে চোখ পরীক্ষা এবং পড়ার মাঝে ‘২০-২০-২০ নিয়ম’ (প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন দেখার পর ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরের বস্তুর দিকে তাকানো) মানার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পাওয়ার বাড়ার গতি কমাতে বিশেষ আই ড্রপ ও চশমা ব্যবহার করা হলেও, রোগ পুরোপুরি নির্মূল করতে পরিবার ও স্কুল স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় অত্যন্ত জরুরি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *