বিদেশের মাটিতে ‘কঠিন’ প্রশ্ন, মুহূর্তেই চর্চায় নরওয়ের সাংবাদিক

বিদেশের মাটিতে ‘কঠিন’ প্রশ্ন, মুহূর্তেই চর্চায় নরওয়ের সাংবাদিক

আন্তর্জাতিক মঞ্চে কিউবা বা ফিলিস্তিনের সঙ্গে ভারতের তুলনা! নরওয়েতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের সময় নরওয়েজিয়ান সাংবাদিক হেলি লিংয়ের এমন এক উসকানিমূলক প্রশ্ন এবং তার পরদিনই ভারতীয় কূটনীতিকদের দেওয়া জোরালো জবাব এখন বৈশ্বিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান চর্চার বিষয়। প্রেস ফ্রিডম বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নামে কীভাবে একটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদাকে আঘাত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, আর নতুন ভারত কীভাবে তার শক্ত কূটনৈতিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে সেই আখ্যান খণ্ডন করছে, এই ঘটনা তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

ঘটনার সূত্রপাত তখন, যখন ওই সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, কেন তিনি সরাসরি সাংবাদিকদের কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হন না। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স’-এ ভারতের ১৫৭তম স্থানের কথা উল্লেখ করে দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে কাঠগড়ায় তোলেন তিনি। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুহূর্তেই ভাইরাল হয় এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও শোরগোল ফেলে দেয়। তবে আসল নাটকীয়তা শুরু হয় এর পরদিনই, যখন ভারত সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে ওই সাংবাদিককে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

পশ্চিমি একচোখা নীতি ও ভারতীয় কূটনীতির কড়া জবাব

সংবাদ সম্মেলনে ভারতের অভিজ্ঞ কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূত সি. বি. জর্জ যেভাবে প্রশ্নগুলির মুখোমুখি হন, তা আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের এক নতুন, আত্মবিশ্বাসী এবং আপসহীন রূপকে প্রকাশ করেছে। মজার বিষয় হলো, যে সাংবাদিক মোদি সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার স্বাধীনতা হরণের অভিযোগ তুলছিলেন, তিনি নিজেই ভারতীয় কূটনীতিকের সম্পূর্ণ জবাব শোনার ধৈর্য দেখাননি; মাঝপথেই ‘জল খাওয়ার’ অজুহাতে ব্রিফিং ছেড়ে চলে যান। এই আচরণই প্রমাণ করে যে, এটি কোনো গঠনমূলক সাংবাদিকতা ছিল না, বরং তা ছিল বিশ্বমঞ্চে ভারতকে খাটো করার একটি পূর্বপরিকল্পিত কৌশল।

রাষ্ট্রদূত সি. বি. জর্জের উত্তর কোনো রক্ষণাত্মক আত্মপক্ষ সমর্থন ছিল না, বরং তা ছিল ভারতের হাজার বছরের সভ্যতা ও বর্তমান বৈশ্বিক অবদানের এক দৃঢ় খতিয়ান। ভারতের পক্ষ থেকে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী কিছু যুক্তি তুলে ধরা হয়। প্রথমত, ভারত কোনো কৃত্রিম বা ঔপনিবেশিক সীমানায় তৈরি হওয়া রাষ্ট্র নয়, এটি ৫ হাজার বছরের পুরনো এক জীবন্ত সভ্যতা। দ্বিতীয়ত, ১৪০ কোটি মানুষের এই দেশে প্রতি ৫ বছর পরপর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনই প্রমাণ করে যে এর গণতান্ত্রিক ভিত্তি কতটা মজবুত। তৃতীয়ত, কোভিড-১৯ অতিমারীর সময় ‘ভ্যাকসিন মৈত্রী’-র অধীনে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে জীবনরক্ষাকারী টিকা পৌঁছে দিয়ে ভারত তার বিশ্বস্ততা প্রমাণ করেছে। চতুর্থত, ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্ব যখন বিভক্ত, তখন ভারতে অনুষ্ঠিত জি২০ সম্মেলনে সব পক্ষকে এক টেবিলে এনে যৌথ ঘোষণা পাস করানো ছিল ভারতের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির এক অনন্য নজির।

সূচকের পক্ষপাতদুষ্টতা ও নতুন ভারতের বার্তা

পশ্চিমি সংস্থাগুলির তৈরি করা ‘প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স’ যে কতটা পক্ষপাতদুষ্ট ও ত্রুটিপূর্ণ, তা এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হয়েছে। ভারতে শত শত ২৪ ঘণ্টার নিউজ চ্যানেল রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন সরকারের তীব্র সমালোচনা লাইভ সম্প্রচারিত হয়; অথচ সূচকে ভারতকে এমন সব দেশের নিচে রাখা হয়, যেখানে নামমাত্র গণতন্ত্র বা গণমাধ্যমের অস্তিত্বই নেই। আসলে, পশ্চিমি গণমাধ্যমের একটি অংশের মধ্যে এখনও উত্তর-ঔপনিবেশিক মানসিকতা কাজ করে। ভারত যখন মহাকাশ বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও ডিজিটাল অবকাঠামোতে পরাশক্তিদের সমকক্ষ হয়ে উঠছে, তখন তারা এই ধরনের কৃত্রিম সূচক ব্যবহার করে ভারতকে মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখার চেষ্টা করছে। অথচ, নরওয়ের নিজস্ব প্রধানমন্ত্রী যখন ভারতীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান, তখন এই তথাকথিত মুক্তমনা সাংবাদিকদের দ্বিমুখী নীতি বজায় রাখতে দেখা যায়।

এই বিতর্কের আরেকটি দুঃখজনক দিক হলো ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে কোনো অন্যায্য আক্রমণের শিকার হন, তখন দেশের ভেতরের একটি অংশ রাজনৈতিক স্বার্থে তাতে আনন্দিত হলে তা সামগ্রিক ভাবমূর্তির ক্ষতি করে। রাজনীতিতে মতাদর্শগত বিরোধ থাকবেই, কিন্তু জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে সবাইকে এক সুরে কথা বলা উচিত। রাষ্ট্রদূত সি. বি. জর্জের একটি বক্তব্য এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, “আমরা বিশ্বের জনসংখ্যার এক-ষষ্ঠাংশ ধারণ করি, কিন্তু আমরা বিশ্বের এক-ষষ্ঠাংশ সমস্যার কারণ নই।”

ভারত বিশ্বকে শূন্য, দাবা, যোগব্যায়াম এবং মহাত্মা গান্ধীর অহিংসার বাণী দিয়েছে। তাই এই ইতিবাচক অবদানসমূহকে আড়াল করে কেবল একটি নেতিবাচক আখ্যান তৈরি করার চেষ্টা কখনোই সফল হতে পারে না। নরওয়ের এই ঘটনাটি ভারতের জন্য কোনো পরাজয় নয়, বরং এটি একটি মস্ত বড় কূটনৈতিক জয়। এর মাধ্যমে নতুন ভারত বিশ্বমঞ্চে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, তারা আর কোনো পশ্চিমি চাপ বা একতরফা সমালোচনার মুখে মাথানত করবে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *