যুদ্ধের ধাক্কায় ‘থ্রি এফ’ সংকটে ভারত, আমজনতার ভাতের থালায় টান পড়ার আশঙ্কা!

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের জেরে বিশ্ববাজারের পাশাপাশি ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে। ইরান যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবে কেবল জ্বালানি তেল নয়, অকল্পনীয় হারে বাড়ছে কৃষির অন্যতম প্রধান উপাদান সারের দাম। এই বহুমুখী সংকটের কারণে দেশের সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের খাদ্য সুরক্ষায় বড় ধরনের টান পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বর্তমান এই কঠিন পরিস্থিতি নিয়ে খোদ কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
মুম্বইয়ে ক্ষুদ্র শিল্প উন্নয়ন ব্যাঙ্কের এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, এই মুহূর্তে ভারতকে প্রধানত তিনটি বিষয়ের ওপর কড়া নজর রাখতে হচ্ছে, যা তিনি ‘থ্রি এফ’ বা ফুয়েল (জ্বালানি), ফার্টিলাইসার (সার) এবং ফোরেক্স (বিদেশিমুদ্রা) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়াটাই এখন একমাত্র বড় চ্যালেঞ্জ নয়, বরং সারের আকাশছোঁয়া দাম এবং সোনার রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধিও ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারের ওপর নতুন করে মারাত্মক চাপ তৈরি করছে।
কারণ ও সংকটের বহুমুখী প্রভাব
চলমান এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে দায়ী করেছেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, এই সংঘাতের প্রভাব শুধু কূটনৈতিক বা ভূ-রাজনৈতিক সীমানায় আটকে নেই। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের জীবনে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কারণে পণ্য পরিবহনে নজিরবিহীন বিলম্ব ঘটছে, হু হু করে বাড়ছে জাহাজের ভাড়া এবং বিশ্বজুড়ে কাঁচামালের তীব্র ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে মূলধনের ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি ভারতীয় পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই সামগ্রিক সংকটের কারণে দেশের বাজারে ইতিমধ্যেই টানা বাড়ছে জ্বালানির দাম। মাত্র এগারো দিনের ব্যবধানে প্রতি লিটার পেট্রলের দাম ৭ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানির এই ঊর্ধ্বগতি এবং সারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির যৌথ ধাক্কায় উৎপাদনে খরচ বাড়ছে, যার চূড়ান্ত প্রভাব গিয়ে পড়ছে আমজনতার নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর মূল্যে।
বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আহ্বান
দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে এবং ডলারের সাশ্রয় ঘটাতে ক’দিন আগেই দেশবাসীর প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া আমদানি বন্ধ করা, বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমানো, অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ স্থগিত রাখা এবং আগামী এক বছরের জন্য সোনা কেনা থেকে বিরত থাকার মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন সাধারণ নাগরিক ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
প্রধানমন্ত্রীর এই পরামর্শকে বর্তমান পরিস্থিতির সাপেক্ষে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও জরুরি বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, এই কঠিন সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখাই ভারতের অন্যতম বড় লক্ষ্য। তবে অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি, অর্থমন্ত্রী দেশের বর্তমান চরম আর্থিক চাপের কথা পরোক্ষে স্বীকার করে নিলেও, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পতনের মূল বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।