আন্তর্জাতিক হকার দিবসেই বাংলায় চলল বুলডোজার, উচ্ছেদ ইস্যুতে ক্ষোভে ফেটে পড়লেন মমতা!

আজ ২৬ মে, আন্তর্জাতিক হকার দিবস। বিশ্বজুড়ে যখন ফুটপাথের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকারদের অবদানকে কুর্নিশ জানানো হচ্ছে, ঠিক তখনই হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে জোরদার রাজনৈতিক তরজা শুরু হল। শিয়ালদহ থেকে হাওড়া, রাজ্যের দুই প্রধান স্টেশনেই হকারদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের ছবি সামনে এসেছে। আর এই বিশেষ দিনটিতেই উচ্ছেদ অভিযানের তীব্র নিন্দা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স হ্যান্ডেলে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে হকারদের উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে খবর মিলেছে। রাজ্যে সদ্য ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকারের দিকে সরাসরি আঙুল তুলে ফুটপাথের ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যদিকে বেআইনি জবরদখল রুখতে রেলের তরফেও চালানো হয়েছে বুলডোজার। ফলে উচ্ছেদ বনাম অধিকারের এই লড়াইয়ে রাজ্য রাজনীতি এখন রীতিমতো উত্তপ্ত।
হাওড়া ও শিয়ালদহে রেলের মেগা ড্রাইভ
কিছুদিন আগেই স্টেশন চত্বর সাফ করার কাজে বড় পদক্ষেপ করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি হাওড়া স্টেশনের জবরদখল হটাতে আরপিএফ (RPF)-এর বিশাল বাহিনী নিয়ে মেগা উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল স্টেশনের সাবওয়ে এবং ডিআরএম অফিসের সামনের বেআইনি দোকান ও ঝুপড়িগুলি। ঠিক একই রকম কড়া পদক্ষেপের ছবি দেখা গিয়েছে শিয়ালদহ স্টেশন চত্বরেও। বুলডোজার চালিয়ে স্টেশন চত্বরের এক বড় অংশ খালি করে দেওয়া হয়েছে।
রেল সূত্রের খবর, যাত্রী সুরক্ষা, নির্বিঘ্ন যাতায়াত এবং স্টেশনের সৌন্দর্যায়নের স্বার্থেই এই বেআইনি জবরদখল মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই আকস্মিক অভিযানের জেরে রুটি-রুজি হারিয়ে কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বহু প্রান্তিক ব্যবসায়ী।
‘বিস্মিত, ক্রুদ্ধ, marmahat’, এক্স হ্যান্ডেলে তোপ মমতার
আন্তর্জাতিক হকার দিবসের দিনে নিজের এক্স হ্যান্ডেলে হকারদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে তীব্র আক্রমণ শানান প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। উচ্ছেদ অভিযানের জেরে যেভাবে বহু পরিবার পথে বসছে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি লেখেন, ‘যেভাবে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেই বিজেপি সরকার হকারদের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে, উচ্ছেদ করছে, তাদের দোকান ভেঙে দিচ্ছে, তাদের চোখের জলকে তোয়াক্কা না করে তাদের পথে বসাচ্ছে সেটা দেখে আমি বিস্মিত, ক্রুদ্ধ, মর্মাহত। অত্যাচারীরা এর জবাব নিশ্চয়ই পাবে।’
তৃণমূল নেত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ফুটপাথের এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা স্থানীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড। জোর করে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে হকারদের পাশে থাকার বার্তা দিয়ে তিনি আরও যোগ করেন, ‘আপনাদের পাশে ছিলাম, আছি, থাকব।’
আইনি সুরক্ষা ও টাউন ভেন্ডিং কমিটির গুরুত্ব
আন্তর্জাতিক হকার দিবসের এই আবহেই মাথা চাড়া দিয়েছে হকারদের আইনি অধিকারের প্রশ্নটি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পোস্টে মনে করিয়ে দিয়েছেন, ফুটপাথচলতি মানুষের যাতায়াতের অধিকার এবং হকারদের জীবন-জীবিকার অধিকার, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সুপ্রিম কোর্ট অতীতে একাধিক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে। ১৯৮৯ সালের ‘সোদান সিং’ মামলা বা ২০১০ সালের ‘গেন্দা রাম’ মামলার হাত ধরেই দেশে তৈরি হয়েছিল ‘স্ট্রিট ভেন্ডর (সুরক্ষা ও নিয়মকানুন) আইন, ২০১৪’।
আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি আরও উল্লেখ করেন, কোনও বিকল্প পরিকাঠামো বা সমীক্ষা ছাড়া খামখেয়ালিভাবে এই আকস্মিক উচ্ছেদ সম্পূর্ণ বেআইনি এবং এটি সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের (জীবন ও জীবিকার অধিকার) পরিপন্থী। হকারদের পুনর্বাসন বা নিয়ন্ত্রণের পুরো প্রক্রিয়াটি গণতান্ত্রিক উপায়ে টাউন ভেন্ডিং কমিটির (TVC) মাধ্যমেই হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। একদিকে যাত্রী সুরক্ষায় প্রশাসনের কড়া অবস্থান, অন্যদিকে জীবিকার অধিকার রক্ষায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর এই ঝাঁঝালো অবস্থান আগামী দিনে হকার পুনর্বাসন নীতিকে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।