মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের, এবার সুর চড়ালেন তৃণমূলেরই আইনজীবী!

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) আইনি ও রাজনৈতিক অস্বস্তি যেন কিছুতেই কমছে না। বিগত বছরগুলিতে বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে তাঁর করা একাধিক ‘বিতর্কিত’ মন্তব্যের জেরে এবার শিলিগুড়ি সাইবার ক্রাইম থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় চমক এসেছে তৃণমূল শিবিরের অন্দর থেকেই। দলেরই এক শীর্ষ নেতার প্রকাশ্য বয়ানে জোড়াফুল শিবিরের অভ্যন্তরীণ ফাটল ও অস্বস্তি পুরোপুরি সামনে চলে এসেছে।
১. কোন কোন ঘটনার ভিত্তিতে এই অভিযোগ?
শিলিগুড়ির সাইবার ক্রাইম থানায় এই লিখিত অভিযোগটি দায়ের করেছেন পেশায় আইনজীবী তথা বিজেপি কর্মী রিঙ্কি চট্টোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগের মূল ভিত্তি মূলত দুটি ঘটনা:
- ২০২৫ সালের ইদের মঞ্চ: অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কলকাতার রেড রোডের ইদের অনুষ্ঠান থেকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হিন্দু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে আপত্তিকর ও উস্কানিমূলক মন্তব্য করেছিলেন।
- ২০২৬ সালের ধর্নামঞ্চ: দ্বিতীয়ত, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে কলকাতার একটি ধর্নামঞ্চ থেকে তিনি আবারও একই ধরনের মেরুকরণ সৃষ্টিকারী ও বিতর্কিত মন্তব্য করেন বলে অভিযোগে জানানো হয়েছে।
পুরনো ক্ষোভ উগরে দিলেন আইনজীবী: রিঙ্কি দেবী দাবি করেন, “২০২৫ সালের ওই ঘটনার পরই আমি শিলিগুড়ির প্রধাননগর থানায় অভিযোগ জানাতে গিয়েছিলাম। কিন্তু তৎকালীন পুলিশ আধিকারিকরা আমার অভিযোগ নেওয়া তো দূরস্ত, চরম দুর্ব্যবহার করে আমাকে থানা থেকে বের করে দেন।” রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অবশেষে তিনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করতে পারলেন এবং কড়া ব্যবস্থার আশা রাখছেন।
২. ‘ওই মন্তব্য করা উচিত হয়নি’ — বিস্ফোরক তৃণমূলেরই অত্রি শর্মা
এই মামলার জেরে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে দার্জিলিং জেলা তৃণমূল কংগ্রেসে। দলের জেলা সাধারণ সম্পাদক তথা পেশায় আইনজীবী অত্রি শর্মা এই প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সামনে যে মন্তব্য করেছেন, তা দলীয় শৃঙ্খলাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
অত্রি বাবু স্পষ্ট ভাষায় বলেন:
“ক্ষমতায় থাকাকালীন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর এই ধরনের মন্তব্য করা একেবারেই উচিত হয়নি। আমরা যাঁরা সেই সময় থেকে আজও দলে নিষ্ঠার সঙ্গে রয়েছি, তাঁরাও কিন্তু মন থেকে এই বিষয়টি সমর্থন করতে পারিনি। তবে ভারতীয় সংবিধানে সবারই আইনি পথে অভিযোগ জানানোর পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার রয়েছে।”
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দলের সুপ্রিমোর বিরুদ্ধে জেলা স্তরের একজন শীর্ষ নেতার এমন প্রকাশ্য অবস্থান প্রমাণ করে যে, মসনদ হারানোর পর তৃণমূলের ভেতরে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও মতবিরোধ এবার বাইরে আসতে শুরু করেছে।
৩. আইনি জালে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও
শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই নন, আইনি টানাপোড়েন শুরু হয়েছে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek Banerjee) ভবিষ্যৎ নিয়েও।
- ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময় উস্কানিমূলক ও উগ্র মন্তব্য করার অভিযোগে বিধাননগর সাইবার থানায় তাঁর বিরুদ্ধেও একটি এফআইআর (FIR) দায়ের হয়েছিল।
- এই মামলার প্রেক্ষিতে ইতিমধ্যেই আদালতের তীব্র ভর্ৎসনার মুখে পড়তে হয়েছে অভিষেককে। একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষনেতা পদে থেকে তিনি কীভাবে প্রকাশ্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে এমন হুমকি দিতে পারেন, তা নিয়ে কড়া প্রশ্ন তুলেছে আদালত।
এক ঝলকে
- ২০২৫ ও ২০২৬ সালে করা বিতর্কিত ও মেরুকরণ মন্তব্য নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে শিলিগুড়ি সাইবার থানায় অভিযোগ।
- “মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ওঁর ওই মন্তব্য করা ঠিক হয়নি” — মন্তব্য করে চরম অস্বস্তি বাড়ালেন দার্জিলিং জেলা তৃণমূল সাধারণ সম্পাদক অত্রি শর্মা।
- বিধানসভা নির্বাচনে উস্কানিমূলক মন্তব্য করায় বিধাননগর থানায় দায়ের হওয়া মামলায় আদালতের কড়া ভর্ৎসনার মুখে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
- একদিকে ক্ষমতাচ্যুতি, অন্যদিকে শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একের পর এক সাইবার ক্রাইমের মামলা— সব মিলিয়ে রাজ্যে চরম ব্যাকফুটে তৃণমূল কংগ্রেস।