হিমবাহ গলে ফুলেফেঁপে উঠছে ঘেপান হ্রদ, কেদারনাথের মতো বিপর্যয়ের মুখে হিমাচলের অটল টানেল ও ৩৪টি গ্রাম

হিমবাহ গলে ফুলেফেঁপে উঠছে ঘেপান হ্রদ, কেদারনাথের মতো বিপর্যয়ের মুখে হিমাচলের অটল টানেল ও ৩৪টি গ্রাম

হিমাচল প্রদেশের লাহুল-স্পিতির শান্ত পাহাড়ি গ্রাম সিসু এখন চরম আতঙ্কের ছায়ায় দিন কাটাচ্ছে। ২০২০ সালে অটল টানেল চালু হওয়ার পর থেকে এখানে পর্যটকদের ঢল নামলেও, প্রকৃতির এক ভয়ংকর রূপ গ্রাস করতে চলেছে এই অঞ্চলকে। গ্রাম থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে, ৪,০৬৮ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত হিমবাহ হ্রদ ‘ঘেপান’-এর জলস্তর ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় বড়সড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, এই হ্রদটিতে ধস বা ভাঙন দেখা দিলে ২০১৩ সালের কেদারনাথের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

চন্দ্র নদীর তীরে অবস্থিত সিসু গ্রামে একসময় কৃষিকাজ ও পশুপালনই ছিল প্রধান জীবিকা। অটল টানেল খোলার পর থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক ও গাড়ির আনাগোনায় এখানকার অর্থনৈতিক চিত্র বদলে গেছে। গড়ে উঠেছে হোমস্টে ও ক্যাফে। নদীর তীরে চলছে বোটিং, জিপলাইনের মতো বিভিন্ন পর্যটন কার্যকলাপ। কিন্তু এই বাণিজ্যিক অগ্রগতির আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে এক মহাবিপদ।

তিন গুণ বেড়েছে হ্রদের আকার

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালে ঘেপান হ্রদের আয়তন ছিল মাত্র ৩৬.৪৯ হেক্টর। ২০২২ সালের মধ্যে তা প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১০১.৩০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। ন্যাশনাল রিমোট সেন্সিং সেন্টার (এনআরএসসি)-এর রিপোর্টে এই হ্রদটিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ১৯৬২ সাল থেকে এই হিমবাহটি ২.৭৬ কিলোমিটার পিছিয়ে গেছে এবং প্রতি বছর গড়ে ৫৩ মিটার করে সংকুচিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় এখন তুষারপাতের পরিবর্তে বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় বরফ গলনের গতি মারাত্মকভাবে ত্বরান্বিত হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের আটটি ভিন্ন পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, হ্রদটি ফেটে গেলে মাত্র ২১ মিনিটের মধ্যে ৪৩ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা বেগে বন্যার জল সিসু গ্রামে আছড়ে পড়বে। এই জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে ধেয়ে আসবে ভারী পাথর, কাদা ও হিমবাহের ধ্বংসাবশেষ। এর ফলে অটল টানেল, মানালি-লেহ মহাসড়কসহ সমগ্র পর্যটন পরিকাঠামো ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে। সেই সঙ্গে ৩৪টি জনবসতি, ৫৭টি সেতু, ২০৪ হেক্টর চাষযোগ্য জমি এবং ১০৬ কিলোমিটার রাস্তা সম্পূর্ণ বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার প্রভাব জম্মু ও কাশ্মীর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

পরিকাঠামোর অভাব ও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি

জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিএমএ) এই হ্রদটিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করার পর বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থা কাজ শুরু করেছে। সিসু হ্রদে সেন্সর, ক্যামেরা ও স্যাটেলাইট-ভিত্তিক পরীক্ষামূলক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা স্থাপন করা হলেও তা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে গ্রামটিতে কোনো স্থায়ী সাইরেন, সতর্কীকরণ বোর্ড বা সুরক্ষিত আশ্রয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট পথ নেই। মাঠপর্যায়ের এই অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

হিমাচল প্রদেশে ২০১৬ সালে ৮০৫টি হিমবাহ হ্রদ ছিল, যা ২০২২ সালের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়ে ১,৬১৯টি হয়েছে। হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চল জুড়ে উষ্ণতা বৃদ্ধির এই প্রবণতা ভবিষ্যৎ বিপর্যয়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে পর্যটন শিল্পের রমরমা অন্যদিকে পরিবেশগত এই মরণফাঁদ, দুইয়ের মাঝে পড়ে সিসু গ্রামের ঘেপান হ্রদটি এখন এক জীবন্ত টাইম বোমায় পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা অবিলম্বে কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *