সুবিধাবাদ ও ফ্যান ক্লাব সংস্কৃতির কড়া সমালোচনা করে সহকর্মীদের খোলা চিঠি কুণাল ঘোষের

সুবিধাবাদ ও ফ্যান ক্লাব সংস্কৃতির কড়া সমালোচনা করে সহকর্মীদের খোলা চিঠি কুণাল ঘোষের

রাজ্যে ভোট-পরবর্তী উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শাসকদলের অন্দরে তৈরি হওয়া ক্ষোভ ও দলত্যাগের জল্পনা নিয়ে এবার প্রকাশ্যেই সরব হলেন বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ। সহকর্মীদের উদ্দেশে লেখা একটি খোলা চিঠিতে দলের ভেতরের স্তাবকতা, সুবিধাবাদ এবং ‘ফ্যান ক্লাব’ সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি। ক্ষমতা বদলাতেই যেসব নেতা সুর বদলাচ্ছেন, তাঁদের এই আচরণকে ‘দৃষ্টিকটূ’ বলে আখ্যা দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, এখন ক্ষোভ প্রকাশের সময় নয়, বরং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আক্রান্ত কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে দলকে পুনর্গঠন করার সময়।

নেতাদের ‘দৃষ্টিকটূ’ আচরণকে তীব্র নিশানা

নির্বাচনের ঠিক পরেই দলের ভুলত্রুটি নিয়ে সোচ্চার হওয়া নেতাদের তীব্র কটাক্ষ করে কুণাল ঘোষ প্রশ্ন তুলেছেন, দল যদি এতই খারাপ ছিল, তবে তাঁরা প্রার্থী হলেন কেন? তাঁর মতে, এক মাসও হয়নি যাঁরা নির্বাচনে জিতেছেন, হেরেছেন কিংবা টিকিট পাওয়ার আশায় এই দলটাকেই ভালো বলে প্রচার করেছিলেন, আজ তাঁদের গলাতেই অন্য সুর শোনা যাচ্ছে। যখন দল ক্ষমতায় ছিল, তখন যাঁরা মন্ত্রিত্বের কামনায় শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে লবিং করতেন, আজ পরিস্থিতি বদলাতেই তাঁদের ‘শ্বাসকষ্ট’ শুরু হয়েছে। তবে একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের চক্রান্তের পাশাপাশি দলেরও কিছু ভুলত্রুটি ছিল বলে তিনি স্বীকার করেছেন, যা নিয়ে আত্মপর্যালোচনা জরুরি। দলের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ে বিস্ফোরক দাবি করে তিনি জানান, দলে একশ্রেণির স্তাবক, সুবিধাবাদী এবং ধান্দাবাজ লোক অতিরিক্ত গুরুত্ব পেয়ে গিয়েছে, যার ফলে তৈরি হয়েছে ‘নেতার ফ্যান ক্লাব, সচিবের ফ্যান ক্লাব, ফ্যানের ফ্যান ক্লাব কালচার’। নিজের রাজনৈতিক যন্ত্রণার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি লিখেছেন, অতীতে এসবের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি নিজে একাধিকবার সাসপেন্ড ও সেন্সরড হয়েছেন, অথচ আজ যাঁরা ‘বিপ্লবী’ সাজছেন, তখন তাঁদের কাউকে পাশে পাওয়া যায়নি।

ঘুরে দাঁড়াতে ৩ দফা পরামর্শ ও ভবিষ্যৎ বার্তা

দলের এই কঠিন সময়ে ‘গেল গেল’ রবে থমকে না গিয়ে কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৩টি মূল পথ বাতলে দিয়েছেন কুণাল ঘোষ। প্রথমত, কঠিন সময়ে আক্রান্ত কর্মীদের পাশে সশরীরে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, দলের সাংগঠনিক কাজ ও জনস্বার্থের কর্মসূচি পুনরায় শুরু করে কেন্দ্র ও রাজ্যের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, যাবতীয় ভুলত্রুটি নিয়ে দলের অন্দরেই খোলাখুলি আলোচনা করতে হবে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দল পুনর্গঠনের আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে হবে। মাঠ-ঘাটে নেতাদের অনুপস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি জানান, সাধারণ মানুষ পাশে থাকলেও নেতাদের অনেকেই এখন অদৃশ্য। স্পষ্ট করে সমস্যা জানানোর পরেও নেতৃত্ব যদি ভুল সংশোধনের পথে না হাঁটেন, তবেই একমাত্র বিকল্প পথ ভাবার সুযোগ থাকবে, তার আগে নয়। নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি জানিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একজন সৈনিক হিসেবেই তিনি দলে আছেন এবং যা উচিত মনে করবেন, তা ভবিষ্যতেও বুক ঠুকে বলবেন। চিঠির শেষে একটি ঐতিহাসিক রূপক ব্যবহার করে তাঁর তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, “আলেকজান্ডার নাই বা হলাম, পুরুর সম্মানটাই থাক। বাকিটা সময় পথ দেখাবে।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *