ধোঁয়াশা কাটল দক্ষিণের রাজনীতিতে, মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়লেন সিদ্দারামাইয়া!

কর্নাটকের রাজনীতিতে এক বড়সড় পটপরিবর্তন ঘটে গেল। সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিলেন বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা সিদ্দারামাইয়া। তবে কেবল ইস্তফাই নয়, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের দেওয়া কেন্দ্রের রাজনীতিতে যাওয়ার বড় সুযোগও ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি। কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী এবং রাহুল গান্ধীর দেওয়া রাজ্যসভার টিকিট ও সাংসদ হওয়ার প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন বিদায়ী এই মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যপাল বেঙ্গালুরুতে উপস্থিত না থাকায় তাঁর বিশেষ সচিবের কাছে ইতিমধ্যেই নিজের ইস্তফাপত্র জমা দিয়েছেন তিনি।
হাইকমান্ডের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ও সক্রিয় রাজনীতির বার্তা
সম্প্রতি দিল্লিতে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সিদ্দারামাইয়ার একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। সূত্রের খবর, লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই কর্ণাটকের অন্দরে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে সিদ্দারামাইয়াকে সরিয়ে উপ-মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমারকে সেই আসনে বসানোর সিদ্ধান্ত নেয় হাইকমান্ড। সিদ্দারামাইয়াকে সম্মানের সঙ্গে কেন্দ্রের রাজনীতিতে নিয়ে আসার জন্য রাজ্যসভার সাংসদ পদের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে পদ ছাড়লেও দিল্লি যেতে নারাজ তিনি। ইস্তফা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সিদ্দারামাইয়া স্পষ্ট জানান, হাইকমান্ড তাঁকে রাজ্যসভার টিকিট দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। দিল্লির অলিন্দে না গিয়ে নিজের রাজ্যের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেই তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকতে চান।
পঞ্চাশ বছরের রাজনৈতিক সততা ও জনমুখী কাজের খতিয়ান
সাংবাদিক বৈঠকে ইস্তফার কথা ঘোষণার সময় কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এই প্রবীণ রাজনীতিক। ১৯৭৮ সাল থেকে শুরু করে প্রায় পাঁচ দশক ধরে নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনই নীতি ও আদর্শের সঙ্গে আপস করেননি। দলবদল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী এবং মল্লিকার্জুন খাড়গের দেওয়া সম্মানের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ করে তিনি দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একাধিক ভুয়ো বয়ান তৈরি করা হলেও তিনি ক্ষমতা বা অর্থের পেছনে ছোটেননি। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর আমলের গ্যারান্টি স্কিমগুলোর পক্ষে সওয়াল করে তিনি জানান, তাঁর সরকারের নীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং নির্বাচনী ইস্তাহারের ৫৫০টি প্রতিশ্রুতির মধ্যে প্রায় ৩০০টিই তিনি পূরণ করতে সক্ষম হয়েছেন।
ইস্তফার কারণ ও কর্ণাটকের রাজনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
সিদ্দারামাইয়ার এই আকস্মিক ইস্তফার মূল কারণ হিসেবে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণ এবং ডি কে শিবকুমারকে মুখ্যমন্ত্রী পদে বসানোর পূর্ব প্রতিশ্রুতিকেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। লোকসভা ভোটের পর থেকেই কর্ণাটক কংগ্রেসে শিবকুমার শিবিরের চাপ বাড়ছিল, যার জেরেই এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে হাইকমান্ড। তবে সিদ্দারামাইয়ার মতো একজন প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় অনগ্রসর শ্রেণির (ওবিসি) নেতাকে সরিয়ে দেওয়ার প্রভাব রাজ্যের রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী হতে পারে। তিনি দিল্লির প্রস্তাব ফিরিয়ে রাজ্যে সক্রিয় থাকার যে বার্তা দিয়েছেন, তা আগামী দিনে নতুন মুখ্যমন্ত্রীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কর্ণাটকের জমি ও জল সংক্রান্ত স্পর্শকাতর বিষয়ে তিনি যেভাবে আপসহীন থাকার ঘোষণা করেছেন, তা আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতিতে তাঁর শক্তিশালী অবস্থান ও নিজস্ব অনুগামীদের ধরে রাখারই কৌশল বলে মনে করা হচ্ছে।