হানি সিংয়ের মাথায় কি আসলে পরচুলা, কেন এমন পরিণতি হলো এই পপ তারকার

হানি সিংয়ের মাথায় কি আসলে পরচুলা, কেন এমন পরিণতি হলো এই পপ তারকার

দীর্ঘদিন পর জনসমক্ষে এসে নিজের জীবনের অন্ধকারতম অধ্যায় নিয়ে অকপট স্বীকারোক্তি দিয়েছেন ভারতের জনপ্রিয় পপ তারকা ইয়ো ইয়ো হানি সিং। একটি আন্তর্জাতিক পডকাস্টে অংশ নিয়ে তিনি জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে মানসিক রোগ বাইপোলার ডিসঅর্ডারের কড়া ওষুধ খাওয়ার কারণে তাঁর মাথার সমস্ত চুল পড়ে গেছে এবং বর্তমানে তিনি পরচুলা বা উইগ ব্যবহার করছেন। এই জনপ্রিয় তারকার এমন মন্তব্য ভক্তদের যেমন চমকে দিয়েছে, তেমনই সাধারণ মানুষের মনে বড় ধরনের কৌতূহল ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

হানি সিং জানান, এই জটিল মানসিক রোগের কারণে টানা সাত বছর তিনি নিজেকে ঘরের মধ্যে বন্দি করে রেখেছিলেন। তীব্র মানসিক ট্রমা ও কড়া পাওয়ারের ওষুধের ধাক্কায় একসময় তাঁর ওজন বেড়ে ১০৫ কেজি হয়ে গিয়েছিল। তাঁর এই পরিস্থিতি মানসিক রোগের চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং এর গভীর প্রভাবকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও চুল পড়ার কারণ

চিকিৎসকদের মতে, বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চিকিৎসায় রোগীর মেজাজের ওঠানামা বা মুড সুইং নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যেসব ‘মুড স্টেবিলাইজার’ বা সাইকিয়াট্রিক ওষুধ ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর কিছু জটিল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। মানুষের চুলের একটি স্বাভাবিক বৃদ্ধির চক্র বা হেয়ার গ্রোথ সাইকেল থাকে। কড়া মাত্রার এই ওষুধগুলো অনেক সময় সেই চক্রে বাধা সৃষ্টি করে চুলের গোড়াকে জোরপূর্বক বিশ্রাম পর্যায় বা রেস্টিং ফেজে পাঠিয়ে দেয়। এর ফলে ওষুধ খাওয়ার কয়েক মাস পর থেকেই ব্যাপক হারে চুল ঝরতে শুরু করে। এছাড়া, এই ধরনের ওষুধ শরীরে পুষ্টির শোষণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং হরমোনের ভারসাম্যে তারতম্য ঘটায়, যার পরোক্ষ প্রভাব পড়ে চুলের ওপর।

শুধু ওষুধই নয়, বাইপোলার ডিসঅর্ডারের মতো জটিল রোগের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় রোগী যে চরম মানসিক চাপ, উদ্বেগ, অনিদ্রা ও মানসিক ক্লান্তির শিকার হন, তাও চুল পড়ার সমস্যাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। নিজের চেনা রূপ বদলে যাওয়া এবং চুল পড়ে যাওয়াটা রোগীর মনে বাড়তি হীনম্মন্যতা ও মানসিক কষ্টের জন্ম দেয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

বাইপোলার ডিসঅর্ডার ও শরীরের ওপর এর সামগ্রিক প্রভাব

বাইপোলার ডিসঅর্ডার মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ব্যাধি, যেখানে রোগীর মেজাজ বা মুড সাধারণ মানুষের মতো থাকে না। রোগী মূলত দুটি চরম অবস্থার মধ্য দিয়ে যান—একটি হলো তীব্র আনন্দের বা উত্তেজনার পর্যায় (ম্যানিয়া) এবং অন্যটি হলো চরম বিষণ্ণতার পর্যায় (ডিপ্রেশন)। সঠিক সময়ে এই রোগের চিকিৎসা না করা হলে মানুষের কর্মজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, বাইপোলার ডিসঅর্ডারের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা কেবল চুলের ক্ষতি করে না, বরং পুরো শরীরের ওপরই প্রভাব ফেলে। এর কারণে রোগীরা তীব্র ক্লান্তি অনুভব করতে পারেন, ওজন হঠাৎ বেড়ে বা কমে যেতে পারে, মনোযোগে ঘাটতি দেখা দেয় এবং পেটের সমস্যা হতে পারে। কোনো কোনো ওষুধের কারণে শরীর কাঁপা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া বা মাথা ঘোরার মতো লক্ষণও দেখা দেয়।

তবে চিকিৎসকরা আশ্বস্ত করেছেন যে, ওষুধের কারণে এই ধরনের চুল পড়া সাধারণত সাময়িক। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধের পরিবর্তন এনে, সঠিক পুষ্টি ও লাইফস্টাইল মডিফিকেশনের মাধ্যমে এই চুল আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হুট করে মানসিক রোগের ওষুধ বন্ধ করা একেবারেই উচিত নয়। হানি সিংয়ের এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটি প্রমাণ করে যে, সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয়, নিয়মিত থেরাপি এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এই কঠিন পরিস্থিতি জয় করে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সম্ভব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *