তৃণমূলের অন্দরে এবার কল্যাণ-কাকলি যুদ্ধ! নারীবিদ্বেষের অভিযোগ তুলে লোকসভার স্পিকারকে চিঠি বারাসাতের সাংসদের

তৃণমূলের অন্দরে এবার কল্যাণ-কাকলি যুদ্ধ! নারীবিদ্বেষের অভিযোগ তুলে লোকসভার স্পিকারকে চিঠি বারাসতের সাংসদের

নিজস্ব প্রতিনিধি: ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে গোহারা হেরে তৃণমূল কংগ্রেস যখন কার্যত কোণঠাসা, তখন দলের অন্দরের গৃহযুদ্ধ এবার পৌঁছাল দেশের সংসদে। প্রবীণ সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম বারাসাতের সাংসদ কাকলি ঘোষদস্তিদারের দীর্ঘদিনের আকচাআকচি এবার সম্পূর্ণ প্রকাশ্য রূপ নিল। শ্রীরামপুরের তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সংসদের ভেতরেই লাগাতার ‘মৌখিক হেনস্থা’ ও ‘নারীবিদ্বেষী’ আচরণের গুরুতর অভিযোগ তুলে সরাসরি লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার দ্বারস্থ হলেন কাকলি ঘোষদস্তিদার। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতি ও জোড়াফুল শিবিরের অন্দরে চরম শোরগোল পড়ে গিয়েছে।

স্পিকারের কাছে কল্যাণের শাস্তির দাবি কাকলির

সংসদীয় সূত্রের খবর, কল্যাণের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করার অনুমতি চেয়ে স্পিকার ওম বিড়লাকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন বারাসাতের ঘাসফুল প্রতীকে জয়ী সাংসদ কাকলি ঘোষদস্তিদার। চিঠিতে তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় লিখেছেন, “লোকসভার ভেতরে আমায় বারবার মৌখিকভাবে চরম অপমান ও হেনস্থা করেছেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। এই ধরনের নারীবিদ্বেষী আচরণ শুধু আমার বিরুদ্ধেই নয়, সংসদের বহু মহিলা সাংসদের সঙ্গেও তিনি করেছেন। এর উপযুক্ত শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।”

এর আগে গত রবিবারই বারাসাত সাংগঠনিক জেলার সভানেত্রী পদ থেকে আকস্মিক ইস্তফা দিয়েছিলেন কাকলি। সেই ইস্তফাপত্রেও তিনি নাম না করে লিখেছিলেন, “যে পদে থাকাকালীন একজন মহিলা সাংসদের ওপর অন্য এক অশিক্ষিত, অভদ্র দলীয় সাংসদের অশালীন আচরণ বন্ধ করা যায় না বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের সহযোগিতা পাওয়া যায় না, সেখানে পদে থাকার কোনো মানে হয় না।” তখন থেকেই রাজনৈতিক মহল নিশ্চিত ছিল যে কাকলির নিশানায় আসলে কল্যাণই।

‘নারদকাণ্ডে ৫ লাখ টাকা আমি নিইনি, উনি নিয়েছেন’— পাল্টা তোপ কল্যাণের

কাকলি ঘোষদস্তিদারের এই স্পিকারকে চিঠি পাঠানো এবং গালিগালাজের অভিযোগকে সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা’ ও ‘আফটারশক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সাফ জানান, “আমি কোনো চিঠি পাইনি। স্পিকার ব্যাখ্যা চাইলে উত্তর দিয়ে দেব। এটা স্রেফ নিজের বাজারদর বাড়ানোর চেষ্টা।” চিঠির তারিখ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “চিঠিতে ২৮ মে-র উল্লেখ রয়েছে, যেদিন সরকারি ছুটি। তাহলে কীভাবে অভিযোগ জমা পড়ল?”

এখানেই থেমে না থেকে কাকলিকে তীব্র ব্যক্তিগত আক্রমণ শানিয়েছেন কল্যাণ। অতীতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আমি সংসদীয় দলের মুখ্য সচেতক ছিলাম। ওঁর আবার কিসের এত কথা? নারদকাণ্ডে তো আমি ৫ লক্ষ টাকা নিইনি, উনি নিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে ‘সিন্ডিকেট’ শব্দের জন্মদাত্রী কে এবং সেই সিন্ডিকেটের জন্মস্থান যে রাজারহাট, তা সকলেই জানেন।” কল্যাণের পাল্টা দাবি, উল্টে কাকলির মুখেই কু-কথার ফুলঝুরি ছোটে।

দলনেতাকে এড়িয়ে কেন স্পিকারের দ্বারস্থ? উঠছে প্রশ্ন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদীয় রীতি অনুযায়ী দলের কোনো সাংসদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বা অভিযোগ থাকলে তা প্রথমে সংসদীয় দলনেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে জানানোই দস্তুর। কিন্তু সেই চেনা পথে না হেঁটে কাকলি কেন সটান স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি লিখলেন, তা নিয়ে দলের ভেতরেই বড়সড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। একাংশের মতে, রাজ্যে দল মুখ থুবড়ে পড়ার পর ‘বুয়া-ভাতিজা’ তথা মমতা-অভিষেকের রাশ আলগা হতেই দলের সাংসদেরা এখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ মানতে নারাজ।

দীর্ঘদিন ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই দুই হেভিওয়েট নেতার বিবাদ ধামাচাপা দিয়ে রাখলেও, ক্ষমতা হাতছাড়া হতেই তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এখন দিল্লির রাজনীতিতে স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সুসম্পর্ক থাকা কল্যাণের বিরুদ্ধে এই চিঠির ভিত্তিতে সংসদ কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপরেই নজর রাজনৈতিক মহলের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *