আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিত, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি এখন ট্রাম্পের হাতে

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিত, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি এখন ট্রাম্পের হাতে

দীর্ঘদিন ধরে চলা আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার তীব্র সামরিক সংঘাত বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিকে চরম অস্থিরতার মধ্যে ফেলেছে। এই সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাবে বিশ্বজুড়ে মাথা চাড়া দিচ্ছে মূল্যবৃদ্ধি। এমন এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মাঝেই একটি ইতিবাচক খবরের আভাস মিলছে। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে ৬০ দিনের একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে পর্দার আড়ালে আলোচনা চলছে। তবে এই প্রস্তাবিত চুক্তিটি বাস্তবায়নে এখন সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত সবুজ সংকেত।

সমঝোতার রূপরেখা ও পরমাণু কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ

সংবাদমাধ্যম এক্সিওস-এর সূত্র অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহের শুরুতেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচকরা ৬০ দিনের একটি সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) খসড়া পরিকল্পনায় একমত হয়েছেন। এই প্রস্তাবটি কার্যকর হলে গত তিন মাস ধরে চলা দুই দেশের মধ্যকার প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত সাময়িকভাবে থামতে পারে, যা বৈশ্বিক স্তরে বড় স্বস্তি এনে দেবে।

প্রস্তাবিত চুক্তির শর্তানুযায়ী, ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথ থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি দিতে হতে পারে। এছাড়া এই ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলাকালীন ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বর্তমান মজুত এবং দেশটির ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়েও দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চালানো হবে। তবে এই আলোচনার সমান্তরালেই মাঠপর্যায়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যা এই সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়াকে যেকোনো সময় ভেস্তে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সিদ্ধান্তে ট্রাম্পের সময় নেওয়া ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জটিলতা

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, চুক্তির অধিকাংশ শর্ত নিয়ে উভয় পক্ষই সমঝোতায় পৌঁছেছে এবং ইরানের আলোচকরা তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমোদন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনও এই প্রস্তাবে চূড়ান্ত অনুমোদন দেননি। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য প্রেসিডেন্ট আরও কয়েকদিন সময় চেয়েছেন।

হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমঝোতার বিষয়ে এখনও কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। ট্রাম্প অতীতে শান্তি চুক্তি খুব কাছাকাছি রয়েছে বলে দাবি করলেও, সাম্প্রতিক মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনার ধীরগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একই সাথে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ওয়াশিংটন এই মুহূর্তে ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো আলোচনা করছে না—যা মূলত তেহরানের প্রধানতম দাবি ছিল। ফলে এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

হরমুজ প্রণালী সচল করা ও অর্থনৈতিক প্রভাব

এই খসড়া আলোচনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালীকে পূর্বের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। বিশ্ব বাণিজ্য, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস পরিবহণের জন্য এই প্রণালীটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পথ হিসেবে বিবেচিত হয়। সংঘাতের কারণে এই রুটে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণরূপে নিষেধাজ্ঞামুক্ত করা হবে। এর বিনিময়ে ইরানকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ওই সমুদ্রসীমায় পেতে রাখা সমস্ত মাইন অপসারণ করতে হবে এবং বাণিজ্যিক জাহাজে যেকোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা বন্ধ করতে হবে। ইরান এই শর্ত পূরণ করলে আমেরিকাও ওই অঞ্চলে তাদের নৌ অবরোধ ধীরে ধীরে শিথিল করার পরিকল্পনা করেছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জোর দিয়ে জানিয়েছে, এই পুরো পরিকল্পনাটি কেবলই একটি অস্থায়ী কাঠামো এবং এটি কোনো স্থায়ী বা চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি নয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *