হাইকমান্ডের নির্দেশে ইস্তফা, কর্নাটকে সিদ্দারামাইয়ার প্রকাশ্য বিদ্রোহে অস্বস্তিতে হাত শিবির

পূর্ণ মেয়াদের আগেই ফের মুখ্যমন্ত্রী বদলের সাক্ষী থাকল কর্নাটক। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশে বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজ্যপাল থাবরচাঁদ গহলতের কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পেশ করেছেন সিদ্দারামাইয়া। তবে অতীতে মাঝপথে সরে যাওয়া চার মুখ্যমন্ত্রীর মতো চুপ থাকেননি তিনি। সাংবাদিক বৈঠক করে প্রকাশ্যে কংগ্রেস হাইকমান্ডের নির্দেশকেই নিজের ইস্তফার কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন সিদ্দারামাইয়া। বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর এই প্রকাশ্য ক্ষোভ কর্নাটকের রাজনীতিতে হাইকমান্ডের বিরুদ্ধে এক স্পষ্ট বিদ্রোহের আভাস দিচ্ছে, যা কেন্দ্র ও রাজ্য রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
এদিকে সিদ্দারামাইয়ার সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা হতেই রাজ্যজুড়ে তুমুল অশান্তি শুরু হয়েছে। বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর অনুগামীরা বিভিন্ন জায়গায় দলীয় দপ্তর ভাঙচুর, পথ অবরোধ, সরকারি দপ্তরে হামলা এবং নেতাদের বাড়িতে হানা দিতে শুরু করেছেন। শুক্রবার সকালে দিল্লি পৌঁছে সিদ্দারামাইয়া অনুগামীদের শান্ত থাকার আর্জি জানালেও পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। রাজ্যে পরবর্তী সরকার গঠন ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সিদ্দারামাইয়া এবং ভাবি মুখ্যমন্ত্রী ডিকে শিবকুমারকে দিল্লিতে তলব করেছে কংগ্রেস নেতৃত্ব।
অস্বস্তিতে কংগ্রেস এবং ভবিষ্যৎ প্রভাব
মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যাওয়ার পর সিদ্দারামাইয়াকে রাজ্যসভায় পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি রাজ্যের রাজনীতিতেই সক্রিয় থাকবেন। বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর এই অবস্থানে তীব্র চিন্তায় পড়েছে কংগ্রেস হাইকমান্ড। ভাবি মুখ্যমন্ত্রী ডিকে শিবকুমারের সঙ্গে সিদ্দারামাইয়ার ব্যক্তিগত সম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে ভালো হলেও, আগামী দিনে ক্ষমতার রাশ কার হাতে থাকবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো কর্নাটকের ‘আহিন্দা’ (সংখ্যালঘু, দলিত, আদিবাসী ও অন্যান্য অনুন্নত শ্রেণী) ভোট ব্যাংক, যার ওপর সিদ্দারামাইয়ার প্রশ্নাতীত প্রভাব রয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, সিদ্দারামাইয়াকে এভাবে সরিয়ে দেওয়ার ফলে এই বড় ভোট ব্যাংকে ফাটল ধরতে পারে এবং সেখানে থাবা বসানোর সুযোগ পেয়ে যেতে পারে বিজেপি। নিজের বা সরকারের কোনো ব্যর্থতার দায় না নিয়ে সিদ্দারামাইয়া যেভাবে পুরো দায় হাইকমান্ডের ওপর চাপিয়েছেন, তাতে দলিত ও অনুন্নত শ্রেণীর ভোটারদের মধ্যে দলের প্রতি ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও ব্যতিক্রমী সিদ্দারামাইয়া
কর্নাটকের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই নিয়ে মোট পাঁচজন মুখ্যমন্ত্রীকে পূর্ণ মেয়াদের আগে দিল্লির চাপে ক্ষমতা ছাড়তে হলো। অতীতে কংগ্রেসের বীরেন্দ্র পাতিল, এস বাঙ্গারাপ্পা এবং বিজেপির বিএস ইয়েদুরাপ্পা ও ডিভি সদানন্দ গৌড়াকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশে মাঝপথে সরে যেতে হয়েছিল। তবে তাঁরা কেউই দলের সিদ্ধান্তের কথা এভাবে প্রকাশ্যে আনেননি; বরং কোনো না কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দায় নিয়ে সরে গিয়েছিলেন।
গত শতকের আশির দশকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী বেঙ্গালুরু বিমানবন্দরে নেমেই অত্যন্ত আসাম্মানজনকভাবে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বীরেন্দ্র পাতিলকে সরানোর ঘোষণা করেছিলেন। পরবর্তীকালে তামিল বিরোধী দাঙ্গা রুখতে ব্যর্থতা ও দুর্নীতির অভিযোগে সরতে হয় এস বাঙ্গারাপ্পাকে। অন্যদিকে, বিজেপির বিএস ইয়েদুরাপ্পা দীর্ঘ দরকষাকষি করে দল ও মন্ত্রিসভায় নিজের পুত্রের পুনর্বাসন নিশ্চিত করার পর ইস্তফা দিয়েছিলেন। তাঁর জায়গায় আসা সদানন্দ গৌড়াকেও দুই বছরের মাথায় দিল্লির নির্দেশে সরতে হয়।
পূর্বসূরিদের তুলনায় সিদ্দারামাইয়ার মুখ্যমন্ত্রিত্বের মেয়াদ অবশ্য অনেক দীর্ঘ। এর আগে ২০১২ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর তিনি সফলভাবে রাজ্য চালিয়েছেন। এই দফাতেও তিন বছরের কিছু বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পর তাঁকে সরতে হলো। তবে অতীতের চারজন মুখ বুজে দিল্লির সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও, সিদ্দারামাইয়া যেভাবে প্রকাশ্য বিদ্রোহের পথ বেছে নিলেন, তা কর্নাটকের রাজনীতিতে কংগ্রেসের জন্য আগামী দিনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে চলেছে।